আমি প্রবাসী বলছি…
ফজলুর রহমান
আমি একজন সাধারণ প্রবাসী। আজকেও মায়ের সাথে কথা হবে। আজ ফোনে আমিই বেশি কথা বলবো। হয়তো একতরফাই বলে যাবো। হয়তোবা এটিই হবে শেষ কথা বলা।
তবে মাকে বলতে দিলেও সেই একই মুখস্থ কথা শোনাবে ‘তুই ভালো আছিস! শরীর ভালো, খুব চিন্তা হয়। হাজার কোটি দোয়া করি। আমি খুব ভালো আছি, অসুখ অনেক কমেছে , আজ একেবারে পেট ভরে খেয়েছি, বেশ আরামে আছি। নাতনিটা খুব আদর করে কথা বলে। দুষ্ট হয়েছে খুব। বৌমাও বেশ দেখেশুনে রাখে আমাকে সবসময়।’
মায়ের অন্য কথাগুলোও আমার জানা,’তোমার পাঠানো টাকায় বাড়ির বাইরের দিকটাও রং করা হয়েছে, মতিন মিয়ার মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা দিয়েছি, নতুন স্কুল ভবনের জন্য টাকা দিয়েছি, মক্তবে দান করেছি, তোমার ভাগিনার পরীক্ষার ফিস দিয়ে দিয়েছি।’
এসব জানি যেহেতু আজ আমিই কেবল বলে যাবো। মা শুধু শুনুক আজ।
মাকে শুরুতেই বলবো। বেশ আরামে আছি। হাতে কাজ নাই। ভালো ভালো খাই। আরামে আয়েশে ঘুমাই। টিভি দেখি। টিভি থেকে শুনে রোগ প্রতিরোধ করা খাবারগুলো বেছে বেছে খাই। মনটাকে শক্ত রাখছি। নিয়মিত দোয়া-প্রার্থনা করি। অনিয়ম করি না। অসতর্ক চলি না। অযথা বাইরে পা রাখি না। অহেতুক টেনশন করি না।
মাকে বলবো, তোমার সাথে কথা বললেই অনেক শান্তি আসে মা। তবে একথা বলবো না, মায়ের হাতের ছোঁয়া পেতে কতোটা কাঙাল হয়ে আছি, ইচ্ছে করে এখনই গিয়ে মায়ের কাছে বসি। কেবল মনে মনেই জপে চলবো ‘দেখিলে মায়ের মুখ, মুছে যায় সব দুঃখ। ‘
ছোট্টসোনা আর প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে খেয়াল রেখে যেতে বলবো। কখনো বলবো না কতোটা হতাশা আর দুঃখের দিন পার করছি এখন আর ওদের জন্য কতোটা বেখেয়াল হচ্ছে মন।
সকলকে আমার মতো হাসিখুশি রাখতে বলবো। বলার সময় লকডাউনজনিত যাতনায় চোখের নোনা জল বের হওয়াটা মনে রাখবো না।
মাকে বলবো বন্ধুদের সাথে হেসেখেলে দিন যাচ্ছে বেশ। কখনো বলবো না এই নিদারুণ একাকিত্বের কথা। ভুলেও বলবো না আজ দেশে থাকলে প্রিয়জন, প্রিয়মুখগুলোকে দেখে জীবন ধন্য হতো, তাদের প্রতিটা স্পর্শ কতোটা অনুভব করছি এই দুঃসহ সময়ে।
দেশে এখন টাকা পাঠানোর সুযোগ কম বলে আপাতত বেশি টাকা এবার দিতে পারছি না-এই কথা মাকে বলবো। তবে এ মাসের বেতন হাতে না পাওয়া আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতে টাকার টানাপোড়েনের বিষয়গুলো বলবো না।
মাকে বলবো এখানে হাত বাড়ালেই সব মিলে। দেশের সবজি-মাছ থেকে বিদেশের নামকরা সব ফাস্টফুড আইটেম হাতের মুঠোয়। কখনো বলবো না দেশের মাটির গন্ধ পেতে কতোটা মাতাল হয়ে আছি, ছোট পুকুরটা আমাকে কতোটা টানছে, বাড়ির পাশের আমের থোকাগুলো কিভাবে আমায় ডাকছে, উঠোনের ওপাশে মেঠোপথ আর সবুজ ঘাসে পা ফেলতে মনটা কেমন আনচান করছে, মাটির সোঁদা গন্ধ লুফে নিতে কতকরে উতলা হচ্ছে মন।
মাকে বলবো, হয়তো আর বেশিদিন নেই, বেশি সময়ও নেই, তোমার দেশে হয়তো চলেও আসতে হতে পারে মা!
তবে এই ফোনকলটি কখনো মায়ের শোনা হবে না। গত ৫ বছর ধরে মা শুনতে পায় না। কারণ বাবা ৭ বছর আগেই পরপারে যাওয়ার পর মাকেও বাবার পাশে রেখে এসেছি ৫ বছর আগে।
যদিও আমি মায়ের সাথে এখনো এভাবে কথা বলে চলি নিত্য।
একবার কবরগাহে গিয়ে মা-বাবার পায়ের দিকের ফাঁকা জায়গাটিতে চোখ আটকে থাকে। ভাবি, তাঁদের কদমতলের জায়গাটি যেন আমার হয়! ওই জায়গায় আমার শেষ ঠাঁই মিলবে কিনা ভাবনা আসতো এক সময়। আজ আর ভাবি না। পরিস্থিতি আজ সব ভাবনার উর্ধ্বে।
এমনই ভাবনা রাখা একজন আজ চলে গেল পাশের ভবন থেকে। সামনের দালান থেকে একজনকে নিয়ে যাওয়ার পর সেও ফিরেনি। প্লাস্টিকে মোড়ানো ডেডবডি হয়ে গণরুমে শুয়ে আছে। একের পর পরদেশে থাকছে চিরঘুমে। দেশের মাটির মমতা বঞ্চিত হচ্ছে চিরতরে।
সংখ্যা একক থেকে দশকে গেল দ্রুত। আরো ত্বরিত গতিতে শতক থেকে হাজার হাজার মুখী।
অনাদরই এখন আমাদের শেষ পাওয়া । অবেলায় নিভে যাওয়া। অবহেলায় শেষ হওয়া।
আমাদের ত্যাগগুলো না বুঝুক সমাজ, দুঃখগুলো না চিনুক রাষ্ট্র। কেবল খোদা জানুক, প্রবাস মানেই সুখের ছদ্মবেশে থাকা এক বুক কষ্ট।
আমাদের বাড়ির উঠোনের কোণায় একটি শিউলি ফুলের গাছ আছে। ছোট্টবেলায় মাকে দেখতাম বোনকে যতন করে মালা গেঁথে দিতে। সাদা সুতোয় শিউলি ফুলের মালা। বোন সে মালা পুরো বেলা সাথে রাখতো। মাথার খোঁপায়। বা গলায়। উঠোনের শিউলি ফুল গাছটি এখনো মনে রয়ে গেছে। মায়ের কবরের শিয়রের কাছেও একটি শিউলি ফুল গাছ দোল খায়। শিয়রের ওই গাছটিসহ আমার মন দুটো গাছের মালিক। দেশে শিউলি গাছ দেখলেই আমার দুটির সাথে মিলিয়ে নিতাম।
এই শিউলি গাছের সাথে আমার বাড়ির উঠোন হাসে। এতে মায়ের মুখ ভাসে। কবরের জায়গাটি চোখে আসে। এই ঘন দুর্দিনে দুটি শিউলি গাছই ভেসে উঠছে বারবার।
ভালো থাকুক ঝরা শিউলি ফুলের উঠোন। ভালো থাকুক শিউলি ফুলের স্নেহসিক্ত মায়ের কোল। ভালো থাকুক শিউলি ফুল তলের সাড়ে তিন হাত ভূমি। ভালো থাকুক ভালোবাসার জন্মভূমি।
হেফাজতে থাকুক প্রিয়জন। নিরাপদে থাকুক প্রিয়মুখ।
এখন এই আমাদের প্রবাস। এখানে হয়তো শ্বাস, অনখানে হয়তো শেষ। হয়তো হবে দেখা। হয়তোবা না।
লেখকঃ ফজলুর রহমান,
সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।