বর্ষার চিঠি

বর্ষার চিঠি

বর্ষার চিঠি এসেছে আজ
কালো মেঘের ভেলায়,
রিমঝিম বৃষ্টির মধুর সুরে
মন মেতেছে খেলায়।

উদাস দুপুরে অঝোর ধারায়
হৃদয় হয়েছে ব্যাকুল,
মিষ্টি ছন্দের বর্ষণে আজ
ভাসছে নদীর কূল।

উচ্চশব্দে ডাকছে আকাশ
ডাকছে বুঝি আমায়,
স্বচ্ছ আকাশের ঐ কালোমেঘ
আমায় নিমন্ত্রণ জানায়।

উদাসী ময়ূর, ময়ূরীর টানে
মেলেছে তার পেখম,
একলা ঘরে বৃষ্টি প্রেমে
মেতেছে আমার কলম।

📝 জাহেদুল ইসলাম
শিলখালী, পেকুয়া,কক্সবাজার।

লকডাউনে শিশুরা

সুলতানা কাজীঃ ‘লকডাউন’ বেশ আলোচিত একটা শব্দ বর্তমান বিশ্বে। এর শাব্দিক অর্থ হলো তালাবদ্ধ করে দেয়া। আবার লকডাউন’ শব্দটির সরল বাংলা– ‘অবরুদ্ধ’ কিংবা ‘প্রিজনে রাখা’ বলে মন্তব্য করেছেন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের সহযোগি অধ্যাপক খন্দকার মুনতাসীর হাসান।

আমরা পুরো পৃথিবীবাসীই অবরুদ্ধ এখন। স্তব্ধতা, নির্জনতা, গুমোটতা.. আমাদের মানিয়ে নিতে হচ্ছে এখন।অন্য রকম বেঁচে থাকার এ লড়াইয়ে বড়দের পাশাপাশি শিশুরাও বর্তমান। আচ্ছা, ওদের কেমন কাটছে প্রহরগুলো?? আনন্দে নাকি বিষাদে? ভালোলাগায় নাকি অবসাদে?? ভাবছি কি আমরা!!

আমার মতে, যন্ত্রমানবের মতো প্রোগ্রামিং মেনে কাজ করা শিশুদের জন্যই এসেছে ‘লকডাউন’! বিস্মিত হচ্ছেন!! ভাবছেন? এ আবার কেমন কথা!
আসলেই সৃষ্টিকর্তার এক আশীর্বাদ হয়েই এসেছে.. শিশুদের জন্যই এ লকডাউন!! এতে আমাদের অত্যুক্তি হওয়ার কথা না!

ভাবুন তো একবার, এই শিশুরা শেষ কবে এতটা সময় বাড়িতে থাকতে পেরেছে? পরিবারের সাথে সময় কাটাতে পেরেছে? নিজের সব কাজ করেও পেয়েছে অবসর? নিজের “শখ” নিয়ে মেতে উঠতে পেরেছে? পেয়েছে পর্যাপ্ত বিশ্রাম?? সাময়িকের জন্যও পেয়েছে মানসিক প্রশান্তি? না, পায়নি, হয়নি!!
এই লকডাউনই সে সুযোগ করে দিয়েছে শিশুদের অপ্রত্যাশিতভাবে।

উদাহরণ হিসেবে আমার মেয়ের কথায়ই বলছি। পুরো লকডাউনের এ সময়টায় সে তার মনের কথা লিখে প্রকাশ করছে! এতে আমার কোনো ধরণের সহযোগিতা সে চায়না! ওর ভাবনাগুলো ও লিখে প্রকাশ করার কথা সে লকডাউনের আগে ভুলেও মাথায় আনতে পারেনি। কারণ সিডিউল অনুযায়ী তাকে চলতে হতো বলে।
আরো অনেক উদাহরণ আছে, ঘটছে ও।।

আমার মনে হয় বাসায়/ বাড়িতে থেকে তারা একঘেয়েমির শিকার তো হচ্ছেইনা বরং অনেকটা সময় তারা নিজের সাথে কাটাচ্ছে। যা আসলে তাদের সবসময়ই পাওয়া উচিত। লকডাউন প্রকৃত অর্থেই ফিরিয়ে দিয়েছে শিশুদের শৈশব। প্লে শ্রেণি থেকে শুরু করে ইঁদুর দৌঁড়ে নাম লেখানো তারপর আর কোনো যতিচিহ্ন পড়েনা তাদের। পড়ালেখার পাশাপাশি বাবা-মার বাড়তি প্রত্যাশা পূরণের চাপও থাকে।

আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরশীল শব্দগুলো ওদের কাছে অজানা, অচেনা। নিজের ওপর ভরসায়ই করতে শিখেনা ওরা। আর তা হচ্ছেনা আমরা বড়দের জন্যই!! আমরা তাদের ওপর একের পর এক বোঝা চাপিয়ে দিই। তাদের সামগ্রিক বিকাশে বাধা দিই আমরা। স্বকীয়তা, স্বাধীন চিন্তার বিকাশ ঘটছেনা ওদের মধ্যে। তৈরি হচ্ছেনা কল্পনাপ্রবণ মন– যা শিশুদের বেড়ে উঠার জন্য একান্ত প্রয়োজন। আমরা বড়রা মনে করি, আঁকতে শেখা, গান, আবৃত্তি, নাচ, সাঁতার, ক্যারাতে–ইত্যাদি ক্লাসে গেলেই বুঝি আমাদের শিশুরা আর পিছিয়ে থাকবেনা।

আমরা শিশুদের সর্বাঙ্গিন বিকাশের জন্য যা যা প্রয়োজন সবই দিই কিন্তু কাজের কাজ কতটুকু হয়?!! ওরা রুটিনে অভ্যস্ত হয়ে পড়ে শুধু। ওদের মঙ্গলের জন্য প্রয়োজন চাপমুক্ত পরিবেশ। সে মুখ্য জিনিস থেকেই ওরা বঞ্চিত হচ্ছে। এ অবস্থা থেকে একটু হলেও ওরা এখন মুক্তির স্বাদ নিচ্ছে। সুযোগ করে নিচ্ছে নিজেদের জগৎ তৈরির। পাচ্ছে অবাধ স্বাধীনতা— যা তাদের জন্মের পর থেকে অধরাই ছিল।

“স্বপ্ন দেখব বলে আমি দু’চোখ পেতেছি”…

ছোট- বড় সকলেই স্বপ্নবাজ! শিশুরা রাতে স্বপ্ন দেখে চকোলেট চিবোচ্ছে। আর বড়রা!! রাতারাতি…..
একটু ভাবি আমরা!! এই লকডাউনের সময়টায় যদি শিশুরা কিছুদিনের জন্য হলেও চাপ মুক্ত হয়, শৈশবকে উপলব্ধি করতে পারে, নিজেদের প্রতিভার বিকাশ ঘটাতে পারে—-তাহলে তাদের সেভাবেই বেড়ে উঠতে দিই লকডাউন উঠে গেলেও!! হুম, পারি আমরা। তার জন্য প্রয়োজন আমাদের মানসিকতার উন্নয়ন। কারণ, চাবিতো আমাদের হাতেই!!

নিরাপদ, জঞ্জালমুক্ত সুস্থ পরিবেশ বিনির্মাণে আমাদের সকলের ঐকান্তিক প্রচেষ্টা যেমন জরুরী তেমনই শিশুদের বাস্তবসম্মত সৃজনশীল ও উদ্যমী মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে আমরাই সহায়ক।।

ভালো থাকুক পৃথিবী। নিরাপদ ও সুস্থ থাকি আমরা সকলেই।।

লেখকঃ সুলতানা কাজী, সহকারি শিক্ষক(বাংলা), অংকুর সোসাইটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

বর্ষাধারায় শুদ্ধ হই!

সুলতানা কাজী: এ এক গুমোট প্রহর! চারদিকে নিষ্প্রাণতা! ভালো থাকার, ভালো রাখার প্রাণপণ লড়াই। সবাই যোদ্ধা!! অন্য রকম, অন্য সময়ের!! গন্তব্য অজানা…আমার, আমাদের, সকলের।।

বসে আছি যেন অন্তহীন কালের অপেক্ষায়!! বাইরে ঝুম বৃষ্টি। কখনো জোরে, কখনো ঝিরিঝিরি। শ্রাবণ’ ছুঁইছুঁই। মনে পড়ছে, ছোটবেলায় দেখা পাল তোলা নৌকার কথা। আচ্ছা, নৌকাগুলো কি এখন আছে আমাদের দেশে? আমি চোখ বন্ধ করে চলে যাচ্ছি, গেরুয়া রঙের ওপর নানা রঙের ছোট কাপড়ের তালি দেওয়া পাল তোলা নৌকার কাছে!!

বর্ষা মানেই মেঘ, বৃষ্টি, নতুন প্রাণ,জেগে ওঠার গান। ঐশ্বর্যের ঋতু, অকৃপণ ঋতু, সমৃদ্ধির ঋতু মানেই হলো বর্ষা। সে সকল প্রকার জরাজীর্ণ, পাপ-তাপ আর পুরাতনকে ধুয়ে মুছে পবিত্র করে তোলে। সে যতটা না কাঁদে, তার চেয়ে বেশি হাসে। প্রকৃতিতে যৌবনের হাওয়া তোলা এ ঋতু আমার ভীষণ প্রিয়। এর সাথে বাঙালির জীবন ও এক সাথে গাঁথা। চারদিকে সবুজের মনোলোভা রূপ আমাদের মোহিত না করে পারেনা। সিক্ত হৃদয় উদ্বেলিত হয় এই সময়ে। বর্ষায় ঝরে কোনো এক আনখোরা লেখকের কলম। অবিরাম…অবিরাম ধারায় চলছে। হয়তো চলবে!

আকাশের ওপর ভাসমান শূন্যতা! মেঘের ওপর মেঘ, তার ও ওপর আকাশ!! জীবন অনিশ্চিত দূর…

"এ ভরা বাদর মাহ ভাদর শূন্য মন্দির মোর"।

বৃষ্টি মুখর দিন। গাছে গাছে ফুল আর বৃষ্টির পরশ। বৃষ্টির পানিতে নৃত্য করে পাখিরা। টাপুরটুপুর বৃষ্টিতে ঝাপসা হয় গাছপালাগুলো। ফুল ফুটে, গন্ধ ছড়ায়,ছড়াবে ও !! মেঘের পরে মেঘ জমবেই… আমি চেয়ে চেয়ে দেখি। এই তো বেশ আছি! কত সুন্দর এই পৃথিবী। এই আকাশ,এই বাতাস, এই বৃষ্টি, এই স্নিগ্ধতা…!

সভ্যতার সাথে তাল মিলিয়ে আমরা হচ্ছি আধুনিক। কিন্তু বৃষ্টি, বর্ষার রূপ অাদিগন্ত একই..। সেই কালো মেঘে ঢেকে থাকা, অঝোর ধারায় বর্ষণ সবই তো স্বর্গীয় বৈশিষ্ট্য। প্রকৃতির অপরূপ রাণী বলে কথা!!

বর্ষা মানেই আবেগ অনুভূতির মাখামাখির সময়। একে নিয়ে মাতোয়ারা হননি এমন কবি সাহিত্যিক পাওয়া যায়না। শুধু কবি সাহিত্যিক নন, সাধারণ মানুষ ও এর বন্দনায় গা ভাসিয়েছেন। কালিদাস থেকে রবীন্দ্রনাথ, জীবনানন্দ বা নির্মলেন্দু গুণ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় থেকে হুমায়ুন আহমেদ… কেউ বর্ষাকে এড়িয়ে যেতে পারেননি।

আমরাও প্রতিনিয়ত জীবনের এই ভাঙাগড়ার খেলার মধ্যে স্বপ্নের জাল বুনি। এই মাটির বর্ষণমুখর সন্ধ্যা, আকাশের পুঞ্জপুঞ্জ মেঘ, ঝিরিঝিরি বৃষ্টির ধারাপাত বড় ভালো লাগে আমার। মনে হয়, আমি যেন সব কিছুতেই মিশে আছি। এই বিশ্বপ্রকৃতির বিশাল আয়োজনে আমি ও এক অতিথি যেন। আমার এ আবোলতাবোল হয়তো করো ভালো নাও লাগতে পারে……. …

মাটি, গাছপালা, পশু-পাখি, নদীনালা সর্বোপরি প্রকৃতিকে আমাদেরই ভালোবাসতে হবে। প্রকৃতিকে ভালোবাসলে প্রকৃতির সাথে আমাদেরও সৌন্দর্য ও ভালোবাসার মেলবন্ধন তৈরি হবে। বর্ষা আমাদের জীবনের অশান্তিগুলো ধুয়ে নিয়ে গিয়ে শান্তির বার্তাবাহক হোক। বর্ষাধারায় শুদ্ধ হই আমরা সকলে।।

লেখকঃ সুলতানা কাজী,
সহকারি শিক্ষক(বাংলা)
অংকুর সোসাইটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।১১/০৭/২০২০।

বৃষ্টি ও ভালোলাগা

বৃষ্টি ও ভালোলাগা

সুলতানা কাজী (নীলু)

বৃষ্টি। যার সমার্থক–মেঘ থেকে জলের পতন, বর্ষণ, পুষ্পবৃষ্টি। আরো অনেক উপনামে ডাকা হয়। কিন্তু আমার তিন বছরের মেয়ের ভাষায় “চাঁদের বুড়ির তান্না” (কান্না)!! বড় মেয়ের ভাষ্য, তাজ্জব ব্যাপার!! কি করে মেঘ সমুদ্র থেকে পানি নিয়ে যায়!! বৃষ্টির সঙ্গে কি এক মায়াবি সম্পর্ক মানুষের!!

বৃষ্টি আমার বড়বেলার ভালোবাসা। ছোটবেলার বৃষ্টি!!! বয়স যত বাড়ছে জীবনের আকাঙ্ক্ষা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। আমার প্রতিও জগতের চাহিদা বাড়ছে। এই আকাঙ্ক্ষা আর চাহিদার মাঝে পিষ্ট হয়ে মাঝে মাঝে দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়! পাগল পাগল লাগে। ঠিক সেইসময় অকস্মাৎ মেঘ ডাকার আওয়াজ পাই। জানালার বাইরে তাকিয়ে দেখি, দিগন্তের কোলে কালো মেঘ খেলা করছে! বাতাস এসে আমাকে দোলায়। বৃ্ষ্টির ঘ্রাণ নাকে এসে লাগে। আমি হারিয়ে যাই এমন এক জগতে, যেখানে আমি অনেক ছোট!!

আমার গ্রামীণ ছোটবেলা! এক পশলা বৃষ্টি যেখানে অনেক আনন্দের। উঠোনে ইচ্ছে মতো ভেজার কি অপার আনন্দ!! কিন্তু একটু ভারী বৃষ্টি হলেই সবার চোখ মুখ আতঙ্কে নীল হয়ে যেতো। শহুরে তরুণী যেখানে বর্ষাকে বেছে নেন তথাকথিত ক্রিয়েটিভ ফ্যাশন কিংবা নান্দনিক স্টাইলের কোলে বসনকে!! সেখানে নিজের দেখা গল্পের নায়িকারা ঠিক মতো কাপড় শুকাতে না পারার কারণে ভেজা কাপড় কেই আবার গায়ে জড়াতেন। কী নিদারুণ কষ্টে কাটতো গরীবদের জীবন! আমাদের বাড়িতে দেখেছি, অনেক মানুষ নিজেদের গরু,ছাগলসহ নিয়ে আশ্রয়ের আশায় চলে আসতো।

মা’ সবার জন্য রান্নায় ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। একটুও বিরক্ত হতেন না। বাড়ির সামনের খালে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষগুলো সাঁতার কাটতো ভয়কে তুচ্ছ করে। পাহাড়ী ঢলে কিছু লাকড়ি পাওয়ার আশায়ই এ সাঁতার!! এটাই হয়তো ওদের সারা বছরের জন্য জমানো লাকড়ি!! আমাদের এই প্রজন্মের জন্য যা রূপকথার গল্প ও হতে পারে!!

রাস্তাঘাট পিচ্ছিল হয়ে যেতো দেখে কতবার আমি আছাড় খেতাম! স্কুলে যাচ্ছিলাম একদিন… পথেই হঠাৎ বাজ পড়া শুরু হলো। কি ভয় পেতাম এই বাজকে!! মাথার ওপরে ছোট্ট ছাতাটা দিয়ে মাটিতে গুটিশুটি মেরে কতক্ষণ যে বসে ছিলাম জানিনা! শেষে এক চাচা পথ দিয়ে যাওয়ার সময় আমায় উদ্ধার করে বাড়িতে দিয়ে আসেন। কলা গাছের ভেলায় (ভোর) চড়তাম আমার দস্যিপনা ভাইদের কল্যাণে!! এত মজা পেতাম!! কিন্তু আমাকে কোনোদিন ওরা বেশিক্ষণ চড়াতো না। এখনও মনে পড়ে বৃষ্টির দিনে ওরা জাল দিয়ে মাছ ধরতো! আমি থাকতাম মাছের ডুলা বাহক! মাছ ফেলে দেয়ার অপরাধে কত লুকানো পিটুনি যে খেয়েছি মনে পড়লে এখনও কান্না পায়!!

আমার মা’ আমাদের বেশি বাইরে যেতে দিতেন না বৃষ্টির সময়! মা’কে ঘুম পাড়িয়ে আমরা বের হতামই। শেষে সন্ধ্যার সময় সব উসুল হয়ে যেত বেতের বাড়িতে!! আমার কাদা, জোঁক কখনোই ভালো লাগতো না। আমার সেজ ভাই কায়দা করে ওসবই আমার গায়ে লাগিয়ে মজা পেতো!! বেশি কান্না করলে, ও আরও বেশি করতো। শেষে টপাস টপাস কয়েকটা দিয়ে মা’র ভয়ে লুকিয়ে থাকতো!!

শৈশবেই আমরা গ্রাম ফেলে শহরে চলে আসি। অন্য রকম পরিবেশ! ভালো স্কুলে ভর্তি যুদ্ধ। শহুরে বৃষ্টির সাথে খাপ খাওয়ানো শিখে গেলাম। স্কুলে যাওয়ার পথে ইচ্ছে করেই হুট ফেলে রাখতাম, বৃষ্টিতে ভেজার জন্য। শুরু হলো আমার বড়বেলার বৃষ্টি প্রেম।

মহাদেব সাহার মতে, কাগজ আবিষ্কারের আগে মানুষ প্রেমের কবিতা লিখে রেখেছে আকাশে। বৃষ্টির সময় কলেজ থেকে ফেরার পথে পুরো পথ আমরা কোমড় পর্যন্ত ডুবে যাওয়া অবস্থায় এসেছি কতবার!! আষাঢ়ের ঘনঘটা শুরু হলেই মা’ খুব একটা কলেজে যেতে দিতেন না। আর আমি কত পরীক্ষার বাহানা সৃষ্টি করে কলেজে যাওয়ার পথ রচনা করতাম। বৃষ্টি আমার কাছে অন্য রকম ভালো লাগা একটা বিষয়। বৃষ্টির সাথে মিশে আছে আনন্দ, আছে বিরহ। প্রকৃতি তার বিচিত্র স্বভাবের অভিব্যক্তি ঘটিয়ে শিল্পরসিক মানুষ মাত্রকেই অভিভূত করে।

রবি বাবু তাঁর “ছিন্নপত্র” গ্রন্থে লিখেছেন,
যখন যা সাজে ভাই
তখন করিবে তাই;
কালাকাল মানা নাই।

এই আকাশের, নদীর,শ্যামল পৃথিবীর একজন হয়ে জন্ম গ্রহণ করেছি বলেই আমার অহংকার। অতীতকে নিয়ে নস্টালজিক হতে যেমন ভালোবাসি, তেমনি ভবিষ্যতের স্বপ্ন দেখতেও। স্বপ্নীল সময়টা যাচ্ছে বয়ে। আজ এই বৃষ্টির অপরূপ দৃশ্য আমার মনে কুহক জাগায়। বৃষ্টির প্রতিটা ফোঁটা নতুন নতুন অনুভূতির সৃষ্টি করে মনের গহীনে। আমি হারিয়ে যাই আমার অতীতে। যা আমার জীবনকে পূর্ণতা দিয়েছে পুরোপুরি। আমার নিজের মধ্যে ধারণ করি আমার পথচলাকে।

দিন রাত বৃষ্টি আর বৃষ্টি কয়দিন ধরে। আমার উপলব্ধিগুলো এলোমেলো হয়ে সাঁতরে বেড়ায় শুধু। কেউ খুঁত ধরুক, কেউ নিন্দে করুক… আমি আমাতেই যাপন করি। আনন্দ বা দুঃখকে যুগপৎভাবে গ্রহণ করার প্রক্রিয়া সকলের এক নয়। যে যার মতো করে বসবাস করে এদের সঙ্গে। কেউ আনন্দের মাঝেও দুঃখ খুঁজেন কেউ বা দুঃখের ভিতর আনন্দ। তাই, মেঘ দেখলেই কেউ কেউ ঘরে ফিরে যাওয়ার জন্য ব্যস্ত হয়ে পড়ে, কেউ আবার বৃষ্টি ভেজার অপেক্ষায় থাকে। কার যে কিসে আনন্দ তা অন্যেরা জানে না।

আমার আনন্দ বেদনার অণুগল্প হয়ে থাকুক বৃষ্টি দিনের বিলাস। সবাই সুস্থ থাকুন, নিরাপদে থাকুন। হিংসা, লোভ, অহংকারকে পায়ে ঠেলে ভালোবাসুন– নিজেকে, সমাজকে, দেশকে।

লেখকঃ সুলতানা কাজী,
সহকারি শিক্ষক(বাংলা)
অংকুর সোসাইটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।।

“স্বনামে পুরুষ ধন্য, পিতৃ নামে আধা, শশুর কুলে পুরুষ ধন্য, তারে বলে গাধা”

বাবার আদর্শ

অধ্যাপক ড. জি.এম. সাদিকুল ইসলাম

“স্বনামে পুরুষ ধন্য
পিতৃ নামে আধা,
শশুর কুলে পুরুষ ধন্য
তারে বলে গাধা”

এই শ্লোকটি আমরা ৯ ভাই জীবনে অসংখ্যবার শুনেছি আমার বাবার কাছ থেকে। তার ব্যাখ্যাও তিনি অতি চমতকার করে বিভিন্ন গল্পের মাধ্যমে বাচ্চা বয়সে মাথার মধ্য ঢুকিয়ে দিতেন। আমাদের ৮ ভাইয়ের ছেলেবেলার গল্প মুটামুটি একই রকম। একই স্কুলে পড়া এবং তারপর ঢাকার কোন কলেজে উচ্চমাধ্যমিক এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, মেডিকেল বা চুয়েট। সে সুত্রে একাধারে ২/৩ ভাই একই স্কুলে বিভিন্ন ক্লাসে পড়ত। ব্যাতিক্রম হল যখন আমার ঠিক আগের ভাইটিকে উন্নত স্কুলশিক্ষার জন্য সবচেয়ে বড় ভাইয়ের সাথে ফরিদপুরে পাচার করা হল। পঞ্চম শ্রেনী থেকে আমি সংসার এর আংশিক দেখভাল করার দায়িত্ব পেলাম। বাবার পা এর সমস্যা প্রকট হবার পুর্বে অল্প কিছুদিন বাজার করার ট্রেনিং নেওয়ার সৌভাগ্য হয়েছিল। শুক্র, সোম ও বুধবার হাটে যেতাম সাথে একজন ভৃত্য পিছে হাটত ধামা (বেতের তৈরি এক ধরনের পাত্র) নিয়ে। আমাকে দেখলেই মাছ ও সবজি বিক্রেতারা দুর থেকে গোলদার সাহেব আসেন বলে ডাক দিত। প্রায় ৩০ বছর আগের ছোট গোলদার কে তাদের সেরাটাই দিতে চাইত। খুব দামাদামি করার প্রয়োজন পড়ত বলে মনে পড়ে না। কখনও মনে হয়েনি তারা সেই বাচ্চাটিকে ঠকিয়ে দিয়েছে। এর কারন মনে হয়ে আমার বাবার অসাধারন ব্যক্তিত্য। তিনি সাথে সাথে হাটে না গেলেও উনার ছায়া দোকানীরা মনে হয় আমার মুখে দেখত। ৬ষ্ঠ ক্লাস হতে সংসারের প্রায় সব আয় ব্যায়ের হিসাব আমাকেই রাখতে হত। আমাদের মূল আয় ছিল কৃষিজমি হতে বছরে একবার উতপাদিত কয়েকশ মন ধান। সেটা গোলায় (Grain Silo) সংরক্ষন করে রাখা হত সারা বছর বিক্রি করে চলার জন্য। একেকবারে ৩০-৫০ মন ধান বিক্রি হত মূলত রাংগা মিয়া নামক ব্যাপারীর কাছে। আমি বড় ২/৩ ভাইয়ের মাসিক খরচের জন্য পাঠানোর জন্য ও সংসারের খরচের টাকা রাংগামিয়ার কাছ থেকে অগ্রিম নিয়ে মানি অর্ডারের জন্য পোষ্ট মাষ্টার দাদুর কাছে টাকা ও ঠিকানা পৌছে দিয়ে আসতাম। রাংগা মিয়াকে বাবার অনুমতি দেওয়া ছিল আমি চাইলে ১৫০০০/= পর্যন্ত সে বিনা বাক্যব্যয়ে দিয়ে দিবে। আমার সহপাঠীরা খুব অবাক হত ৬ষ্ঠ শ্রেনী পড়ুয়া বালকের উপর তার বাবা, ব্যাপারী রাংগা মিয়া ও পোষ্ট মাষ্টার দাদুর আস্থা দেখে। আমি চাইলে যে এর থেকে কিছু টাকা উড়িয়ে বিপথে যেতে পারতাম না তা না। কিন্তু বাবার প্রায় সবকথাই আমাকে দারুনভাবে প্রভাবিত করত।
সংসারের দায়িত্ব পাওয়ার সাথে সাথে লোহার সিন্ধুকের চাবিও আমার দায়িত্বে থাকত। সেই সিন্ধুকের মধ্যে আমাদের টাকা পয়সা, দলিল, গুরুত্বপুর্ন কাগজপত্র থাকত। সিদ্ধুকের সবচাইতে ভিতরের অংশ যেটাকে বলা হত Safe Vault সেটা খোলা বন্ধ করার জন্য বিশেষ ট্রেনিং দরকার হয়। খুব অল্প সংখ্যকবার সেটা খোলা/বন্ধ করা হত। কারন সেখানে অতি যত্লে সুরক্ষিত থাকত বিভিন্ন ’আমানত’। অভিজাত বাড়ী বা বাবা স্কুলের ওস্তাদজী হওয়ায় আমাদের সিন্ধুকে বাইরের মানুষের হাত কখনও পড়েনি। দুর-দুরান্ত হতে মানুষ আসত কারও কিছু জমানো টাকা রাখতে হবে, কারও বা গয়না অথবা জমির দলিল। এগুলো সাদা কাগজে অথবা কাপড়ে মুড়ে Safe Vault এ যত্নে রাখা হত আর যখনই সে ফেরত নিতে আসত তখন প্রদান করা হত। বাবা বলতেন মানুষ বিশ্বাস করে সম্পদ রাখতে সবাইকে দেয় না, এ এক বিরাট সন্মানের বিষয় এটা মনে রাখবা। তাই নিজের সম্পদ সিন্ধুকের বাইরে Compartment এ রেখে Safe Vault এ পাবলিক প্রপার্টি রাখতে বলতেন। সন্তানদের পড়ালেখা ও সংসার খরচ ধান বিক্রি করে সংকুলন হত না। আমার আম্মা তার প্রায় সব গহনা আমাদের ১০ ভাই-বোন এর পিছনে ব্যায় করে দিয়েছিলেন। আমার বাবা গর্ব করে মানুষকে ডেকে বলতেন “আমি এক বিঘা না, দুই বিঘা না, কুড়ি বিঘা সম্পত্তি বিক্রি করেছি সন্তানদের পড়ালেখার জন্য। আমি কি ভুল করেছি?” আমি এর অনেকগুলো বিক্রির সাক্ষী। নিজের Safe Vault এ টাকা থাকার পরও তিনি প্রয়োজনে জমি বিক্রি করে দিয়েছেন কিন্তু ‘আমানত’ এ কখনও হাত দেননি। উনার বক্তব্য ছিল ঐ ব্যক্তি যে যে টাকার নোট জমা রেখেছেন হুবহু তাই ফেরত দিতে হবে, এই আমানত।
এই দুটি বিষয়ে আমার নিজের ব্যাখ্যা ছিল সে সময়ে যে টাকাপয়সা আমি লেনদেন করেছি তা আমার কাছে একান্নবর্তী পরিবারের আমানত। আর তা খরচ করে ফুটানি মারলে তো বাবার টাকা উড়ানোর জন্য আমার মর্যাদা হবে আধা। তাই আমানতের সুরক্ষা করতে হবে ও স্বনামে ধন্য পুরুষ হবার জন্য সচেষ্ট থাকতে হবে।
লেখকঃ অধ্যাপক ড. জি.এম. সাদিকুল ইসলাম, অধ্যাপক, পুরকৌশল বিভাগ, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় (চুয়েট)।

স্বপ্ন দেখা পাখি

স্বপ্ন দেখা পাখি
-মিশকাত মিশু।

একদিন বৃষ্টি নামবে উঠোন জুড়ে।
ঝুম বৃষ্টি গড়িয়ে পড়বে ঘরের চালা বেয়ে।
অদূর দূরে কোন এক কদম গাছের ডালে
ডানা ঝাপটাবে কোন এক নীড়ভাঙা পাখি।
যে পাখিটি স্বপ্ন দেখেছিল তার নীড় ঘেষে
ফুটবে বর্ষার প্রথম কদম।
যে পাখিটি স্বপ্ন দেখেছিল কোন এক শীতের দিনে
উড়ে যাবে হলুদ সর্ষে ক্ষেতে।
স্বপ্ন দেখেছিল উদাস দুপুরে ভরাপুকুরে
মাছের খেলা দেখবে।
শুধু ঝড়ে ভাঙেনি তার নীড়, উড়ে গেছে তার
স্বপ্ন দেখার সাথীটি ও নতুন কোন আকাশের খুঁজে।
তারপর,
আমি রোজ একলা দুপুরে সেই পাখিটির দুচোখে
স্বপ্নেরঘোর দেখি।
তারপর আমার উঠোন জুড়ে বিকেল আসে,
সন্ধ্যে নামে।
সেই পাখিটির স্বপ্ন দেখা থামেনা।
আমার উঠোনে সকাল হাসে,
আমি সেই পাখিটির নিথর দেহের ওপর
রাতের ঝরে ভেঙে পড়া কদমফুল দেখি।

লেখকঃ মিশকাত মিশু,

কবি ও শিক্ষিকা।

করোনা সংকট! স্থবির শিক্ষাব্যবস্থা! আমাদের প্রজন্ম ভাবনা

সুলতানা কাজী (নীলু):

শঙ্কা, ভয়, আতঙ্ক নিত্যসঙ্গী এখন!। গত পরশু আমার এক ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট করলেন, যেন এ ব্যাপারে কিছু লিখি! ভেবে দেখলাম, সত্যিইতো!! আমি শিক্ষক হিসেবে আমারও কিছু দায়বদ্ধতা আছে।

দু’দিন আগে হোক আর দু’দিন পরে হোক করোনার তাণ্ডব হয়তো থেমে যাবে। জীবন তার স্বাভাবিক গতি ফিরে পাবে। পরের হিসেবটা আমাদের এখন থেকেই করতে হবে।

আমার মতে, এই দুঃসময়ে একজন শিক্ষার্থীর সবচেয়ে বড় কাজ হবে ঘরের কাজে মা-বাবাকে হেল্প করা। স্বাভাবিকভাবে পড়ালেখার ব্যস্ততার কারণে হয়তো তা হয়ে ওঠেনা। কিন্তু এই অফুরন্ত সময়ে মা-বাবার কিছুটা হলেও কাজে হাত লাগিয়ে আশীর্বাদ অর্জন করা অনেক বড় পূণ্যার্জন হবে আশা করি।

শিক্ষার্থীরাই জাতির ভবিষ্যৎ। ভবিষ্যতে তাদেরকেই দেশের হাল ধরতে হবে। বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত হয়ে দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিশ্বকল্যাণে কাজ করবে তারাই। তাই চলমান দীর্ঘ ছুটিকালীন পড়ালেখাকে ও ছুটি দেয়া যাবে না। এক্ষেত্রে একজন মনীষীর উদাহরণ টানছি আমি —-

জ্ঞান বিজ্ঞানের অসংখ্য শাখায় সুগভীর পাণ্ডিত্য অর্জনকারী বিখ্যাত জ্ঞানতাপস “আল বেরুনি” মৃত্যু শয্যায় শায়িত। এ সময় তাঁর এক বন্ধু তাঁর সাথে দেখা করতে আসলেন। বেরুনি” এ অবস্থায় তাকে প্রশ্ন করে বসলেন গণিত সম্পর্কে। প্রশ্ন শুনে বন্ধুটি বিস্ময় ভরা কণ্ঠে বললেন, তুমি এ অবস্থায় ও নতুন কিছু জানতে চাচ্ছ?!! বেরুনি” বললেন, প্রশ্নের সমাধান জেনেই মৃত্যু সুধা পান করা উত্তম নয় কি?? বন্ধুটি চলে যাওয়ার কিছুক্ষণ পরেই “আল বেরুনি” মৃত্যু বরণ করলেন।।

সুতরাং মৃত্যুর আগ পর্যন্ত পড়ালেখা করে জ্ঞানার্জন করাই জ্ঞানীর কাজ।

আমাদের এই পরিস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি দেখতে হবে সন্তান যেন কোন কিছুতে আসক্ত হয়ে না পড়ে। বর্তমানে কম্পিউটার, ল্যাপটপ, আইপ্যাড, ট্যাব,মোবাইল ফোন আমাদের পরিবারেরই একটা অংশ বলে বিবেচিত হচ্ছে। কিন্তু আমাদের খেয়াল রাখতে হবে, কোনোভাবেই যেন আসক্তি চলে না আসে এসবের প্রতি।

মনোবিদদের মতে, আসক্তির ফলে ঘুমের সমস্যা হবে, ঘুম পরিপূর্ণ না হলে মস্তিষ্কের অপরিপক্কতা তৈরি হতে পারে। শরীরে দেখা দিতে পারে নানা প্রতিকূলতা। পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার আসতে পারে। মানসিক ও মনস্তাত্ত্বিক সমস্যা হতে পারে।

এ প্রতিকূলতা থেকে রেহাই পেতে আমার মতে সুস্থ ধারার গান শোনা, ভালো মানের সুস্থ ধারার মুভি দেখা, খেলাধুলা, শরীরচর্চা বিষয়ক কন্টেন্ট দেখার ব্যাপারে আমরা ওদের উদ্বুদ্ধ করতে পারি।

করোনাকালীন এ সময়টা আসলে শিক্ষার্থীদের খাঁটি জ্ঞান অর্জনের, মনের আনন্দে পড়ার এক বিশাল সুযোগ করে দিয়েছে বিধাতা। যদি মূল বইটা পড়া হয়ে যায় দেখা যাচ্ছে ওদের এক ধরণের চোখ খুলে যায়। জ্ঞানের দিগন্ত প্রসারিত হয়ে যায় তখন। যা পড়েছে, চিন্তা করেছে সেগুলোর ওপর বাংলা ও ইংরেজি যার যেটা ইচ্ছা, কিছু টপিক লিখতে দিলে ওরা মনের আনন্দে লিখে ফেলার চেষ্টা করবে বলে আমি আশাবাদী। তাতে ওদের লেখার ক্ষমতা বাড়বে, সৃজনশীলতা প্রকাশ পাবে, পরীক্ষায় মুখস্তের অভ্যাসও কমে যাবে বলে মনে করি। আর এভাবে দীর্ঘ গৃহবন্দিত্বের সময়ও কেটে যাবে।

ভয়, উৎকন্ঠা ও উদ্বেগকে প্রশ্রয় না দেয়ার পক্ষে ওদের কাউন্সেলিং করতে হবে। মানসিকভাবে সবাইকে স্ট্রং থাকতে হবে। এটাই একমাত্র মেডিসিন বলে আমি মনে করি।

করোনাকে ভয় নয় বরং সচেতনতা এবং আন্তরিকভাবে ব্যক্তিগত সুরক্ষা অবলম্বন করার মাধ্যমে আমাদের নতুন স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসতে হবেই। নিশ্চয়ই দুঃসময় একদিন দূর হয়ে সোনালি রঙিন আলো আসবে। ততদিন সাবধানে থাকি সবাই। নিজে বাঁচি, অন্যকে ও বাঁচাতে এগিয়ে আসি।।

লেখকঃ সুলতানা কাজী (নীলু) , শিক্ষিকা, অংকুর সোসাইটি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়, চট্টগ্রাম।

কোন ১৩ ব্যক্তির আমল কবুল হয়না?

অধ্যাপক নুরুজ্জামান মঞ্জুঃ

মুসলমানদের ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য ৩টি শর্ত রয়েছে। সেগুলো হলোঃ

১। ঈমান থাকতে হবে। অর্থাৎ পরিপূর্ণ ঈমানদার হতে হবে। ঈমানে গলদ থাকলে আমল কবুল হওয়ায় সন্দেহ থাকে।
২। আমল রাসুল (সাঃ) এর সুন্নত অনুসারে হতে হবে।
৩। আমল করতে হবে ইখলাসের সাথে। অর্থাৎ কেবল আল্লাহকে খুশি করার জন্য, আবেদ, হাজী-গাজী উপাধীর জন্য করা আমল আল্লাহ কবুল করেননা।

যে ১৩ ব্যক্তির আমল কবুল হয়নাঃ
১। ইসলাম গ্রহণ করার পর যদি কেউ আবার শিরকী কর্মে ফিরে যায়। অর্থাৎ মুশরিক হয়ে যায়। তবে কেউ যদি খালেস নিয়তে তওবা করে ফিরে আসে তবে আল্লাহ তাআলা তাকে ক্ষমা করে দিতে পারেন।
২। অপবিত্র অবস্থায় সালাত আদায় করলে তা কবুল হয়না।
৩। ইনকাম হালাল হতে হবে। হারাম ইনকাম দিয়ে দান-সদকা ও অন্যান্য ইবাদত কবুল হয়না।
৪। ঐ মহিলার নামাজ কবুল হয়না যে সালাতের সময় ঠিকমত সতর ঢাকেননা।
৫। ঐ মহিলার নামাজ নামাজ কবুল হবেনা যিনি সুগন্ধি ব্যবহার করে মসজিদে যায় এবং সে সুগন্ধ অন্যদের নাকে যায়। তবে বাসায় এসে সুগন্ধি থেকে মুক্ত হয়ে ইবাদত করলে আল্লাহ কবুল করতে পারেন।
৬। ঐ ব্যক্তি যিনি কোন মসজিদের ইমাম যাকে মুসল্লিরা অপছন্দ করে অথচ তিনি ইমামের পদটা আঁকড়ে থাকেন।
৭। ঐ মহিলা যার স্বামী তার ওপর অসন্তুষ্ট অবস্থায় একা রাত কাটায় অথচ সে নির্বিঘ্নে ঘুমায়।
৮। ঐ গোলাম বা কৃতদাস যে মালিক থেকে পালিয়ে যায়।
৯। ঐ ব্যক্তির কোন আমল কবুল হবেনা যে পবিত্র নগরী মদিনায় অশান্তি বা ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করে বেড়ায়।
১০। মা-বাবার অবাধ্য সন্তানের আমল কবুল হয়না।
১১। দান করে বা কোন উপকার করে যে খোটা দেয়।
১২। যে তকদীরে অস্বীকার করে।
১৩। ঐ শাসকের আমল কবুল হয়না যে আল্লাহর দেয়া বিধান অনুযায়ী বিচার-ফায়সালা না করে ভিন্ন পথ অবলম্বন করে।

আমল কবুল হওয়ার ৩টি শর্ত এবং ১৩ ব্যক্তির আমল কবুল না হওয়ার বিষয়টি রাসুল (সাঃ) এর হাদিসের আলোকে নির্ধারিত।

লেখকঃ আরবী অধ্যাপক, রাজাখালী বিইউআই ফাযিল মাদ্রাসা, পেকুয়া, কক্সবাজা।

আমি প্রবাসী বলছি…

আমি প্রবাসী বলছি…

ফজলুর রহমান

আমি একজন সাধারণ প্রবাসী। আজকেও মায়ের সাথে কথা হবে। আজ ফোনে আমিই বেশি কথা বলবো। হয়তো একতরফাই বলে যাবো। হয়তোবা এটিই হবে শেষ কথা বলা।

তবে মাকে বলতে দিলেও সেই একই মুখস্থ কথা শোনাবে ‘তুই ভালো আছিস! শরীর ভালো, খুব চিন্তা হয়। হাজার কোটি দোয়া করি। আমি খুব ভালো আছি, অসুখ অনেক কমেছে , আজ একেবারে পেট ভরে খেয়েছি, বেশ আরামে আছি। নাতনিটা খুব আদর করে কথা বলে। দুষ্ট হয়েছে খুব। বৌমাও বেশ দেখেশুনে রাখে আমাকে সবসময়।’

মায়ের অন্য কথাগুলোও আমার জানা,’তোমার পাঠানো টাকায় বাড়ির বাইরের দিকটাও রং করা হয়েছে, মতিন মিয়ার মেয়ের বিয়ের জন্য টাকা দিয়েছি, নতুন স্কুল ভবনের জন্য টাকা দিয়েছি, মক্তবে দান করেছি, তোমার ভাগিনার পরীক্ষার ফিস দিয়ে দিয়েছি।’

এসব জানি যেহেতু আজ আমিই কেবল বলে যাবো। মা শুধু শুনুক আজ।

মাকে শুরুতেই বলবো। বেশ আরামে আছি। হাতে কাজ নাই। ভালো ভালো খাই। আরামে আয়েশে ঘুমাই। টিভি দেখি। টিভি থেকে শুনে রোগ প্রতিরোধ করা খাবারগুলো বেছে বেছে খাই। মনটাকে শক্ত রাখছি। নিয়মিত দোয়া-প্রার্থনা করি। অনিয়ম করি না। অসতর্ক চলি না। অযথা বাইরে পা রাখি না। অহেতুক টেনশন করি না।

মাকে বলবো, তোমার সাথে কথা বললেই অনেক শান্তি আসে মা। তবে একথা বলবো না, মায়ের হাতের ছোঁয়া পেতে কতোটা কাঙাল হয়ে আছি, ইচ্ছে করে এখনই গিয়ে মায়ের কাছে বসি। কেবল মনে মনেই জপে চলবো ‘দেখিলে মায়ের মুখ, মুছে যায় সব দুঃখ। ‘

ছোট্টসোনা আর প্রিয়তমা স্ত্রীর দিকে খেয়াল রেখে যেতে বলবো। কখনো বলবো না কতোটা হতাশা আর দুঃখের দিন পার করছি এখন আর ওদের জন্য কতোটা বেখেয়াল হচ্ছে মন।

সকলকে আমার মতো হাসিখুশি রাখতে বলবো। বলার সময় লকডাউনজনিত যাতনায় চোখের নোনা জল বের হওয়াটা মনে রাখবো না।

মাকে বলবো বন্ধুদের সাথে হেসেখেলে দিন যাচ্ছে বেশ। কখনো বলবো না এই নিদারুণ একাকিত্বের কথা। ভুলেও বলবো না আজ দেশে থাকলে প্রিয়জন, প্রিয়মুখগুলোকে দেখে জীবন ধন্য হতো, তাদের প্রতিটা স্পর্শ কতোটা অনুভব করছি এই দুঃসহ সময়ে।

দেশে এখন টাকা পাঠানোর সুযোগ কম বলে আপাতত বেশি টাকা এবার দিতে পারছি না-এই কথা মাকে বলবো। তবে এ মাসের বেতন হাতে না পাওয়া আর অনিশ্চিত ভবিষ্যতে টাকার টানাপোড়েনের বিষয়গুলো বলবো না।

মাকে বলবো এখানে হাত বাড়ালেই সব মিলে। দেশের সবজি-মাছ থেকে বিদেশের নামকরা সব ফাস্টফুড আইটেম হাতের মুঠোয়। কখনো বলবো না দেশের মাটির গন্ধ পেতে কতোটা মাতাল হয়ে আছি, ছোট পুকুরটা আমাকে কতোটা টানছে, বাড়ির পাশের আমের থোকাগুলো কিভাবে আমায় ডাকছে, উঠোনের ওপাশে মেঠোপথ আর সবুজ ঘাসে পা ফেলতে মনটা কেমন আনচান করছে, মাটির সোঁদা গন্ধ লুফে নিতে কতকরে উতলা হচ্ছে মন।

মাকে বলবো, হয়তো আর বেশিদিন নেই, বেশি সময়ও নেই, তোমার দেশে হয়তো চলেও আসতে হতে পারে মা!

তবে এই ফোনকলটি কখনো মায়ের শোনা হবে না। গত ৫ বছর ধরে মা শুনতে পায় না। কারণ বাবা ৭ বছর আগেই পরপারে যাওয়ার পর মাকেও বাবার পাশে রেখে এসেছি ৫ বছর আগে।
যদিও আমি মায়ের সাথে এখনো এভাবে কথা বলে চলি নিত্য।

একবার কবরগাহে গিয়ে মা-বাবার পায়ের দিকের ফাঁকা জায়গাটিতে চোখ আটকে থাকে। ভাবি, তাঁদের কদমতলের জায়গাটি যেন আমার হয়! ওই জায়গায় আমার শেষ ঠাঁই মিলবে কিনা ভাবনা আসতো এক সময়। আজ আর ভাবি না। পরিস্থিতি আজ সব ভাবনার উর্ধ্বে।

এমনই ভাবনা রাখা একজন আজ চলে গেল পাশের ভবন থেকে। সামনের দালান থেকে একজনকে নিয়ে যাওয়ার পর সেও ফিরেনি। প্লাস্টিকে মোড়ানো ডেডবডি হয়ে গণরুমে শুয়ে আছে। একের পর পরদেশে থাকছে চিরঘুমে। দেশের মাটির মমতা বঞ্চিত হচ্ছে চিরতরে।

সংখ্যা একক থেকে দশকে গেল দ্রুত। আরো ত্বরিত গতিতে শতক থেকে হাজার হাজার মুখী।
অনাদরই এখন আমাদের শেষ পাওয়া । অবেলায় নিভে যাওয়া। অবহেলায় শেষ হওয়া।

আমাদের ত্যাগগুলো না বুঝুক সমাজ, দুঃখগুলো না চিনুক রাষ্ট্র। কেবল খোদা জানুক, প্রবাস মানেই সুখের ছদ্মবেশে থাকা এক বুক কষ্ট।

আমাদের বাড়ির উঠোনের কোণায় একটি শিউলি ফুলের গাছ আছে। ছোট্টবেলায় মাকে দেখতাম বোনকে যতন করে মালা গেঁথে দিতে। সাদা সুতোয় শিউলি ফুলের মালা। বোন সে মালা পুরো বেলা সাথে রাখতো। মাথার খোঁপায়। বা গলায়। উঠোনের শিউলি ফুল গাছটি এখনো মনে রয়ে গেছে। মায়ের কবরের শিয়রের কাছেও একটি শিউলি ফুল গাছ দোল খায়। শিয়রের ওই গাছটিসহ আমার মন দুটো গাছের মালিক। দেশে শিউলি গাছ দেখলেই আমার দুটির সাথে মিলিয়ে নিতাম।

এই শিউলি গাছের সাথে আমার বাড়ির উঠোন হাসে। এতে মায়ের মুখ ভাসে। কবরের জায়গাটি চোখে আসে। এই ঘন দুর্দিনে দুটি শিউলি গাছই ভেসে উঠছে বারবার।

ভালো থাকুক ঝরা শিউলি ফুলের উঠোন। ভালো থাকুক শিউলি ফুলের স্নেহসিক্ত মায়ের কোল। ভালো থাকুক শিউলি ফুল তলের সাড়ে তিন হাত ভূমি। ভালো থাকুক ভালোবাসার জন্মভূমি।
হেফাজতে থাকুক প্রিয়জন। নিরাপদে থাকুক প্রিয়মুখ।

এখন এই আমাদের প্রবাস। এখানে হয়তো শ্বাস, অনখানে হয়তো শেষ। হয়তো হবে দেখা। হয়তোবা না।

লেখকঃ ফজলুর রহমান,
সহকারী রেজিস্ট্রার, চট্টগ্রাম প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।

একটি দুঃস্বপ্ন!

একটি দুঃস্বপ্ন!

ড. জাকির হাওলাদার

দূরে দাঁড়িয়ে থাকা একজন বলছেন আমি নাকি মারা গেছি! আজকে ২০২০ সালের মে মাসের ২৩ তারিখ। আর দুইদিন পর রোজার ঈদ। আমার লাশের কাছে কেউ আসতেছেনা। এমনকি আমার নিকটাত্মীয়রাও। আসবেইবা কেন? করোনা রোগীর আশেপাশে নাকি ভাইরাস কিলবিল কিলবিল করে। তাই কাছে এসে কেউ আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি কেন নিবে? আসলে আমি যে মরি নাই একথা কাউকে বলতে পারতেছিনা। আর একটা লোকও আমার কাছে এসে দেখতেছে না যে আমি সত্যি সত্যিই মরে গেছি কিনা।

লাশ কি আবার দেখতে, শুনতে পায়? কিন্তু আমি আজকে চোখে না দেখলেও কানে কিন্তু সবই শুনতেছি। তাইলে আমি লাশ কেন? দূরে দাঁড়িয়ে আমাকে নিয়ে একজন মন্তব্য করছে, “লোকটা ঘাড়ত্যাড়া! এত একটা কঠিন রোগ হওয়ার পরও হাসপাতালে গেলোনা। এখন চাঁদপুরে এই লোকের লাশ কে নিয়ে যাবে?” শুনলাম অন্য একজন বলছে, “পুলিশকে খবর দিলে ভাল হয়। পুলিশই চিন্তা করবে কি করা যায়।” তখন প্রথম ব্যক্তি বললো, “না পুলিশকে খবর দিলে ঝামেলা বাড়বে। আমাদের পুরো এলাকাটাই লকডাউন করে দিবে।

আমি ত্যাড়ামি করে হাসপাতালে যাইনি এটি একটি ডাহামিথ্যে কথা। আমি প্রতিবাদ করতে চাইলাম কিন্তু মুখে আওয়াজ করতে পারতেছিনা।

৭/৮ দিন আগে আমার জ্বর, কাশি, মাথা ব্যাথা শুরু হলে ফোনে এক ডাক্তার বন্ধুর পরামর্শ চাই। সে আমাকে দ্রুত হাসপাতালে যাওয়ার পরামর্শ দেয়। চারদিন যাবৎ বউ-বাচ্চাদের থেকে আলাদা থাকতেছি। অনেক অনুরোধ করে এক রিক্সাওয়ালাকে নিয়ে চট্টগ্রাম মেডিকেলের উদ্দ্যেশ্যে রওয়ানা হই। মেডিকেলের পূর্বগেইট দিয়ে ঢুকতে যেয়ে বাধা পেলাম। গেইটের সিকিউরিটির একজন বললো,
“ভিতরে করোনা আক্রান্ত রুগীতে তিল ধারণের ঠাই নেই। বারান্দার ফ্লোরেও অনেক করোনা রুগী। এখানে ঢুকলে কষ্ট পাবেন। বরং বাসায় চলে যান, ঠিকমতো ভাল খাবার খান এবং কোন ডাক্তারের পরামর্শ নিয়ে ঔষধ খান। ভাল হয়ে যাবেন।”

টনটনে ব্যাথায় মাথা দাড়া করতে পারছিনা। মোবাইলটা হাতে নিয়ে আশেপাশের প্রাইভেট ক্লিনিকগুলোতে ফোন করলাম। অধিকাংশই বন্ধ, যে দু’একটা খোলা আছে সেগুলোতে সীট খালি নেই। বাসায় ফিরে এলাম। ডাক্তার বন্ধুকে ফোন করে হাসপাতালে ভর্তি না হতে পারার কথা জানালে সে কিছু ঔষধের নাম বললো এবং বাসায় দৈনিক চারবার নেবুলাইজ করাতে বললো। আবাসিকে আমার বাসার পাশে যে ফার্মেসি থেকে সবসময় ঔষধ কিনি সেখানে গেলাম। সেলসম্যান আবছার বললো, “স্যার এই ঔষধগুলো নাই। কেবল প্যারাসিটামল আর ওরস্যালাইন নিতে পারেন। কয়দিন যাবৎ ঔষধ কোম্পানিগুলোর কোন সাপ্লাই নাই।” রিক্সাওয়ালাকে ভাড়া দিয়ে বাসার গেইটে ঢুকলাম। জ্বর, মাথাব্যথা ও প্রচন্ড কাশি, গেইট থেকে বাসা পর্যন্ত নিজকে টেনে নিতে পারছিনা। মন চাচ্ছে গেটের কাছেই শুয়ে পড়ি। কোন রকম মে বাসায় ঢুকে দূর থেকে স্ত্রীকে নেবুলাইজ মেশিনটা আমার রুমের সামনে রাখতে বললাম। সে আমাকে বললো, “সকাল থেকে বিদ্যুৎ নাই, নেবুলাইজ মেশিন কি করে চালাবেন?”
সে আরো বললো, আজকে রাতের খাবার চলবে কিন্তু কালকে ভাতের চাল শেষ হয়ে যাবে। মুদি দোকানদারকে ফোন করে বাসায় চালের বস্তা পাঠাতে বলেছিলো কিন্তু দোকানদার বললো আপাতত দোকানে কোন চাল নেই, খাতুনগঞ্জ আড়ৎ থেকে তারা আজকে চাল আনতে পারেনি। আড়তে চাল নেই। নতুন চালান আসলে তারা বাসায় চাল পাঠিয়ে দেবে।

করোনা উপসর্গ দেখা দেয়ার আজকে ৬ষ্ঠ দিন। দুইদিন যাবৎ বাসায় বিদ্যুৎ নেই। শুনলাম অধিকাংশ বিদ্যুৎ স্টেশন বন্ধ হয়ে গেছে। ফার্মেসিগুলোতে ঔষধ নেই, মেডিসিন ও মেডিকেল সরঞ্জামে তীব্র সংকট, দোকানগুলোতে তীব্র খাদ্য সংকট, এক সপ্তাহ যাবৎ ইন্টারনেট বন্ধ, ব্যাংকগুলো বন্ধ, কোন লেনদেন হচ্ছেনা, অধিকাংশ প্রাইভেট ক্লিনিক চিকিৎসক সংকটে বন্ধ হয়ে গেছে। করোনা আক্রান্তদের চিকিৎসা দিতে গিয়ে সবচেয়ে বেশী ক্ষতিগ্রস্ত চিকিৎসকরাই। গত দুইমাসে দেশের ৪০% ডাক্তার ও নার্স মারা গেছেন। জনগণের সেবা দিতে গিয়ে প্রশাসনের লোকদের অনেকেই মারা গেছেন। শুনেছি সর্বশেষ ২৪ ঘন্টায় সারাদেশে মারা গেছে ১৭৬৩ জন। কার খবর কে নিবে, পুরো দেশটাই যেনো একটা মৃত্যুপুরী। আমার স্ত্রী বেচারি দুটো ছোট বাচ্চাকে সামলাবে নাকি আমার টেককেয়ার করবে।

কে একজন বলেছিলেন করোনা আক্রান্ত হলে ভেঙ্গে পড়া যাবেনা, সাহস রাখতে হবে। অনেক কষ্টে দরজার কাছে রেখে যাওয়া ভাত-তরকারি টেনে রুমে এনে খাওয়ার চেস্টা করলাম। ২/৪ লোকমা খাওয়ার পর আর সম্ভব হলোনা। বেহুশের মতো পড়ে থাকলাম। গভীর রাতে ঘুম ভাঙলো, নিজকে কিছুটা সুস্থ মনে হলো। মায়ের কথা মনে পড়লো, আমার মেয়ে উমায়রাকে একটু দেখতে মন চাইলো। কিন্তু তাদেরকেতো দেখা সম্ভব নয়। চোখের কোনায় পানির অস্তিত্ব উপলব্ধি করলাম।

সপ্তম দিন। এখন কি রাত না দিন সেটা বুঝার কোন উপায় নেই। কারণ আমি এখন লাশের মতই নির্জীব পড়ে আছি। তবে দূরে দাঁড়ানো লোকদের কথা শুনে মনে হলো এখন দুপুর। শুনলাম একজন বলছেন যে, গ্রামের বাড়িতে লাশ পাঠানো সম্ভব না। আবাসিকের কবরস্থানেও অনুমতি পাওয়া যাবেনা। এখানে প্লটের মালিক ও ভিআইপি মানুষরা দাফনের সুযোগ পায়। দূর থেকে গরম পানি ছিটিয়ে মুর্দা গোসলের কাজ সেরে প্লাস্টিকে পেচিয়ে কোন রকমে শমশেরপাড়া গোরস্থানে দাফন করে ফেলা দরকার। কথামতো গোসল দেওয়ার জন্য দূর থেকে একজন আমার গায়ে গরম পানি ছিটাতে লাগলো। গরম পানিতে নাকি করোনা ভাইরাস মরে যায়।
গায়ে গরম পানির লাগায় ঘুম ভেঙ্গে গেলো। আমার ছেলে জায়ান আমার গায়ে প্রস্রাব করে দিয়েছে।

(এটি একটি দুঃস্বপ্ন হলেও লকডাউনে সরকারের সিদ্ধান্তগুলো যদি আমরা অমান্য করি, আর্মি ও পুলিশ প্রশাসনের সাথে লুকোচুরি খেলি, বর্তমানে যে হারে আক্রান্ত ও মৃতের সংখ্যা বাড়তেছে আল্লাহ না করুক শিঘ্রই আমাদেরকে এই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হবে।
আসুন আমরা রাষ্ট্রীয় সিদ্ধান্তকে সম্মান জানাই এবং যার যার ধর্মানুযায়ী সৃষ্টিকর্তার কাছে ক্ষমাভিক্ষা চাই।
ভাল থাকুন আপনি। ভাল থাকুক বাংলাদেশ। আমার দুঃস্বপ্ন বাস্তব না হউক।)