রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গঠনে কি গুরুত্ব ভিটামিন-ডি ও ভিটামিন-ই এর?

এখন পর্যন্ত করোনা ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার সর্বোত্তম পন্থা হলো সামাজিক দূরত্ব বজায় রেখে নিজকে নিরাপদ রাখা। চিকিৎসা বিজ্ঞান বলছে
আমাদের দেহে শক্ত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে পারি তাহলে এই জীবানু সহজে আক্রমণ করতে পারেনা। শরীরে মজবুত রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা গড়ে তুলতে যে সমস্ত উপাদানগুলো প্রয়োজন তার মধ্যে ভিটামিন-ডি ও ভিটামিন-ই অন্যতম। আসুন জেনে নেই এই দুটি ভিটামিন সম্পর্কে।

ভিটামিন-ডিঃ
অন্যান্য সকল পুষ্টি ‍উপাদানের মতো ভিটামিন ডি’ও আমাদের শরীরের জন্য খুবই জরুরি। চিকিৎসা বিজ্ঞানীদের মতে, প্রতিদিন ভিটামিন-ডি ৭ থেকে ১৫ মিলিগ্রাম পরিমান প্রাপ্ত বয়স্কদের খাওয়া উচিত। হাড়, দাঁত ও পেশি সুস্থ রাখতে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উপাদান এই ভিটামিন। ভিটামিন ডি’য়ের অভাবজনীত কারণে বিভিন্ন রোগ দেখা দেয়। যেমনঃ অবসাদ, ক্লান্তি, হাড়জনীত ব্যথা, বিভিন্ন ক্ষত সারতে বিলম্ব, চুল পড়া, মানসিক বিষণ্নতা ইত্যাদি।

ভিটামিন ডি তৈরি হয় কোলেস্টেরল থেকে, যখন ত্বক সূর্যের আলোর সংস্পর্শে আসে।
এই ভিটামিনের সবচাইতে বড় উৎস হল সূর্যালোক এবং শরীরের প্রতিটি কোষেই ভিটামিন ডি গ্রহনকারী গ্রন্থি বিদ্যমান। এছাড়াও ভোজ্য উৎস যেমন- মাছ ও দুগ্ধজাত পণ্যেও এই ভিটামিন মেলে।

ভিটামিন-ইঃ
ভিটামিন-ই আটটি ফ্যাট দ্রবণীয় যৌগের একটি গ্রুপ যার মধ্যে চারটি টোকোফেরল এবং চারটি টোকোট্রা্ইনল। এই ভিটামিন একটি চর্বিযুক্ত দ্রবণীয় অ্যান্টিঅক্সিড্যান্ট যা প্রতিক্রিয়াশীল অক্সিজেন প্রজাতি থেকে কোষের ঝিল্লি সুরক্ষা দেয়। ভিটামিন-ই এর ঘাটতি যা বিরল এবং সাধারণত ভিটামিন-ই পরিমান খাদ্যে কম এর চেয়ে ডায়েটরি ফ্যাট হজমের অন্তর্নিহিত সমস্যার কারণেই বেশি হয়। এর ফলে স্নায়ুজনিত সমস্যা তৈরি করতে পারে।

যে সমস্ত খাবারে ভিটামিন-ই পাওয়া যায়ঃ
গম, সূর্যমুখীর তেল, কুসুম ফুল তেল, বাদাম তেল, কাজু বাদাম, পাম তেল, জলপাই তেল, সয়াবিন তেল, চিনাবাদাম, ভুট্টার খই, পেস্তা বাদাম, কাঁচা শাক, ব্রোকলি, মাছ, ঝিনুক, মাখন, পনির, ডিম, মুরগির মাংস, গরুর মাংস, দুধ ইত্যাদি।

আমাদের দেশের ফার্মেসীগুলোতে ভিটামিন-ডি ও ভিটামিন-ই ক্যাপসুল পাওয়া যায়। তবে ভিটামিন চাহিদা পূরণে এসব ক্যাপসুল কতটুকু কার্যকরী সে ব্যাপারে আমরা নিশ্চিত নই। সবচেয়ে উত্তম হলো সূর্যের রোদ গ্রহণ ও আমিষ খাবারগুলো গ্রহ।

মাস্ক পরবেন নাকি ভেন্টিলেশনে যাবেন?

জাকির হাওলাদারঃ আগে ভেন্টিলেটর বলতে আমরা বিল্ডিংয়ের ভেন্টিলেটরকেই বুঝতাম। চিকিৎসা বিজ্ঞানের সাথে সংশ্লিষ্টতা ব্যাতিত অন্যদের কাছে এই শব্দটির ব্যবহার খুবই কম। করোনাভাইরাস মহামারির মোকাবেলায় হাসপাতালগুলোতে যথেষ্ট সংখ্যক ভেন্টিলেটর সরবরাহ করার জন্য বিশ্বের বহু দেশের সরকারের উপর যখন প্রচণ্ড চাপ শুরু হয় তখনই এটি বিশ্বব্যাপী আলোচনার বিষয় হয়ে দাড়ায়।

ভেন্টিলেটর কি?
উইকিপিডিয়ায় ভেন্টিলেটরর বর্ণনা দেওয়া হয়েছে এভাবে-

“ভেন্টিলেটর হল ‘লাইফ সেভিং ডিভাইস’। একে বলা হয় সাপোর্টিভ চিকিৎসা। অনেক সময় রোগ জটিলতা সর্বোচ্চ পর্যায়ে পৌঁছলে দেখা যায় রোগী নিজে থেকে শ্বাস নিতে পারছেন না। তাঁর শ্বাসযন্ত্র ঠিকঠাক কাজ করছে না। রেসপিরেটরি ফেলিওর হচ্ছে। তখন কৃত্রিম উপায়ে বাইরে থেকে মেশিনের সাহায্যে শ্বাসপ্রশ্বাস চালু রাখার চেষ্টা করা হয়। এটাই ভেন্টিলেশন। আর যে যন্ত্রের সাহায্যে এ চিকিৎসা দেওয়া হয়, সেটি হল ভেন্টিলেটর। সেই সঙ্গে চলে অন্যান্য রোগের চিকিৎসা। যাতে রোগীকে বাঁচিয়ে তোলা যায়। সাধারণত টার্মিনাস স্টেজেই ভেন্টিলেটরে রাখা হয়। তাই মানুষ ভাবেন, ভেন্টিলেশন শুরু হলে রোগীর আর ফেরার সম্ভাবনা নেই। তবে একথা ঠিক যে ভেন্টিলেশনে থাকলেই সব রোগীর ভালো হবে ওঠার নিশ্চিন্ত আশ্বাস নেই। সবসময় শেষরক্ষা করা যায় না। কিন্তু, সঠিক রোগের ক্ষেত্রে সঠিকভাবে ভেন্টিলেশন চালু হলে রোগী সুস্থ হয়ে উঠতে পারেন।
যেসব রোগীর সংক্রমণ খুবই মারাত্মক তাদের জীবনরক্ষায় ভেন্টিলেটর খুবই কার্যকর এক যন্ত্র।”

করোনা ভাইরাস আক্রান্তদের বেলায় রোগীর ফুসফুস যদি কাজ না করে তাহলে রোগীর নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কাজটা ভেন্টিলেটর করে দেয়। এর মাধ্যমে সংক্রমণের বিরুদ্ধে লড়তে এবং পুরোপুরিভাবে সেরে উঠতে রোগী হাতে কিছুটা সময় পান। নানা ধরনের ভেন্টিলেশন যন্ত্র দিয়ে এই কাজটা করা হয়। এই যন্ত্রটি চাপ দিয়ে ফুসফুসে বাতাস ঢোকায় এবং দেহে অক্সিজেনের সরবরাহ বাড়িয়ে দেয়।

ভেন্টিলেটরে একটি হিউমিডিফায়ারও থাকে। এর কাজ হলো রোগী দেহের তাপমাত্রার সাথে মিল রেখে বাতাস এবং জলীয় বাষ্প ঢোকানো। ভেন্টিলেটর ব্যবহারের সময় রোগীকে এমন ওষুধ দেয়া হয় যাতে তার শ্বাসযন্ত্রের মাংসপেশিতে কোন উত্তেজনা না থাকে।

এখন কথা হলো, এই ভেন্টিলেটর করোনা আক্রান্তের নিঃশ্বাস-প্রশ্বাসের কাজ স্বাভাবিক রাখার জন্য কিভাবে কাজ করে তা জানুন Dr. Rajiv Mazumdar,
Resident, Urology, Dhaka Medical College Hospital এর কাছ থেকে। উনি লিখেছেন,

“কোভিড-১৯ এর ভেন্টিলেশন মানে একটি নল, যা আপনার গলা দিয়ে নামানো হয় আর মরা বা বাঁচা পর্যন্ত রেখে দেওয়া হয়।
রোগীর কথা বলা, খাওয়া বা স্বাভাবিক কিছুই করতে পারে না- এই যন্ত্রই তাঁদের বাঁচিয়ে রাখে।
আর এতে যে ব্যথা বা অস্বস্তির সৃষ্টি হয়, তা থেকে বাঁচার জন্য মেডিকেল এক্সপার্টরা ব্যথানাশক ও চেতনানাশক দিয়ে রাখেন যেন রোগী নলটা সহ্য করতে পারেন।
এভাবে চিকিৎসার ২০ দিন পর একজন কমবয়সের রোগী তার ওজনের ৪০ ভাগ হারায়, মুখে আর শ্বাসনালীতে ঘা হয়ে যায় এবং কোন কোন ক্ষেত্রে ফুসফুস বা হার্টের সমস্যাও দেখা দেয়।
এই কারণেই বৃদ্ধ কিংবা দুর্বল স্বাস্থ্যের রোগীরা এই চিকিৎসা নিতে পারে না, দ্রুতই মৃত্যুবরণ করেন।
তরল খাবারের জন্য নাক দিয়ে বা চামড়া ছিদ্র করে যেভাবেই হোক রোগীর পাকস্থলীতে নল দেওয়া হয়, তরল মল ধরার জন্য আরও একটা ব্যাগ লাগানো হয়, প্রস্রাব ধরার জন্য একটা আর স্যালাইনের জন্য শিরাপথেও আরও একটা নল দিতে হয়।
দুই ঘন্টা পরপর একজন নার্স বা স্বাস্থ্য সহকারী আপনার হাত পা নাড়াচাড়া করিয়ে দেয় আর আপনি পড়ে থাকেন একটা তোশকের ওপরে, যার ভিতর দিয়ে বরফ ঠান্ডা তরল আপনার প্রতি মুহুূর্তের বেড়ে যাওয়া তাপমাত্রা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা করে।
এসময়ে আপনার আপনজনেরা আপনার কাছে একদমই আসতে পারেন না।
ভাবুন একটি ঘরে একা আপনি আর আপনার যন্ত্র।”

সুতরাং সচেতনতার সাথে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে, মাস্ক পরে চলাফেরা করবেন না ভেন্টিলেশন এর মতো জঘন্য চিকিৎসার সম্মুখীন হবেন সে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দায়িত্ব আপনার।

করোনা কি বাংলাদেশে ব্যার্থ হবে?

ড. জাকির হাওলাদারঃ ইতালি, ফ্রান্স, আমেরিকার মতো বাংলাদেশে করোনা ভাইরাস এতো বেশী সুবিধা করতে পারবেনা আশা করি। আপনি হয়তো বলতে পারেন যে, দিন দিন তো আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেছেই। উত্তরে আমি বলবো হ্যা আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেছে ঠিকই কিন্তু মৃত্যুর হার সেদিক থেকে সন্তোষজন। এতো অনিয়মের দেশে অবস্থা আরো ভয়াবহ হতে পারতো কিন্ত হয়নি।

আজকে বিকাল পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনাক্রান্ত নিশ্চিত হয়েছে ১০১৪৪ জন কিন্তু সুস্থ হয়েছেন ১২০৯ জন আর মৃত্যুবরণ করেছে ১৮২ জন। আক্রান্তদের মধ্যে ১২০৯ জন ও ১৮২ জন বাদ দিলে বাকিদের অবস্থা কি?

এই উত্তর আসলে সহজ নয়। দিনদিন কিন্তু আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেছে এবং এই সংখ্যা আরোও মারাত্মক হারে বাড়বে মনে হয় কিন্তু মৃত্যুর সংখ্যা কমতেছে। ধরে নেন এদেশের শতকরা ৮০ ভাগ লোক আক্রান্ত হবে আবার পূর্নাঙ্গ লক্ষন প্রকাশের আগেই ভালও হয়ে যাবে৷ বাকি ২০ ভাগের ভিতর ৫% লোকের অবস্থার অবনতি হবে। করোনায় আক্রান্ত ভাল হয়ে যাওয়া অন্যদের বেলায় এখন পর্যন্ত প্রধান মেডিসিন হলো আল্লাহর দেওয়া এন্টিবডি।

ইউরোপ, আমেরিকার মানুষরা অধিকাংশই স্বাস্থ্য সচেতন। তাদের জীবনযাপনের মানও আমাদের চেয়ে উন্নত। অন্যদিকে আমাদের ঘনবসতির এই দেশে স্বাস্থ্য সচেতনতা খুবই কম, লকডাউনে অধিকাংশই নিয়ম মানছেনা, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সাথে করছে লুকোচুরি খেলা, স্বাস্থ্যসেবার মানও সুবিধাজনক নয়। দিন দিন আক্রান্তের সংখ্যা বাড়তেছে অথচ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিগুলো খুলে দেওয়া হয়েছে, মসজিদে জামায়াত পড়তে নিষেধ করা হয়েছে অথচ অনেকেই বাড়ির ছাদের উপর বিরাট জামাত করে নামাজ পড়ছে! অফিস ছুটির সুযোগে সপরিবারে গ্রামের বাড়ি গিয়ে অনেকে পিকনিজের মুডে আছে। করোনাক্রান্ত রুগী পালিয়ে হাসপাতাল থেকে পালিয়ে যাওয়ার দৃষ্টান্ত পৃথিবীর আর কোথাও আছে?
এরপরেও ইতালি, ফ্রান্স, আমেরিকায় করোনাক্রান্ত হয়ে যেভাবে মারা গেল আমাদের দেশে অবস্থা আরোও ভয়াবহ হওয়ার কথা। কিন্তু সেরকম হয়নি। এ অবস্থার জন্য আসলে রহস্যটা কি?

চিকিৎসা বিজ্ঞানসূত্রে এখন পর্যন্ত যা জানলাম তাতে বুঝা গেলো এই ভাইরাস যখন গলায় বাসা বাধে তখন এন্টিবডি যুদ্ধ শুরু করে করোনার সাথে। অধিকাংশের ক্ষেত্রে করোনা এন্টিবডির কাছে পরাজিত হয়। যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম তাদের ক্ষেত্রে এসময় ভাইরাস ফুসফুসে চলে যায়। ফুসফুসে ইনফেকশন করে ফেললে রক্ত চলাচলের নালিতে পানি জমে। তখন রক্ত চলাচলে বাধা সৃষ্টি হয়। দেখা যায় একজন হার্টের রুগীর ফুসফুস আক্রান্ত হয়েছে। রক্ত সঞ্চালন ঠিকমত না পাওয়ায় হার্ট কার্যকারিতা হারায়। এভাবে বড়বড় রোগে আক্রান্ত ব্যাক্তিরা বেশিমাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয় যদিও এসময় এন্টিবডি ভাইরাসের রিরুদ্ধে লড়তে থাকে। কিন্তু আগের ভিন্ন রোগের মাত্রা বেড়ে যাওয়ায় লড়াই করার মত পর্যাপ্ত সময় আর থাকেনা।

এককথায় করোনাক্রান্ত হয়ে আবার সুস্থ হয়ে ওঠা পুরাটাই নির্ভর করে এন্টিবডি কার কতটা শক্তিশালী সেটার উপর।

এখন প্রশ্ন হলো করোনা শক্তিশালী এন্টিবডির কাছে হার মানে তাহলে ইউরোপ আমেরিকায় কেন মৃত্যুর মিছিল লেগে গেল? তাদের কি এন্টিবডি দূর্বল? আমার মনে হয় ভয়ের তাদের এন্টিবডি ধ্বংস হয়েছে। যারা একটু বেশি বয়সী তাদের এমনিতেই এন্টিবডি অর্থাৎ রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম থাকে। একারনে বয়সীদের মৃত্যু ঝুঁকি বেশি। ইউরোপ আমেরিকায় বয়স্ক লোকের হার বেশি।

এবার আসি দেখি বাংলাদেশের মানুষের এন্টিবডি শক্তিশালী হওয়ার কারণ কি? আমাদের দেশের মানুষের খাদ্যভ্যাস একটু ভিন্ন রকমের। এদেশের মানুষরা অতিমাত্রায় মশলা জাতীয় খাবার খায়। যার অধিকাংশ ঔষুধী গাছ। আদা, রাসুন, কালি জিরা, মরিচ সবই শরীরের জন্য উপকারী যা ইউরোপ, আমেরিকা চীনের খাদ্য অভ্যাসে নেই। তাই ওদের থেকে বাংলাদেশের মানুষের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বেশি। দেখবেন একজন ইউরোপীয় ব্যাক্তিকে মশা কামড় দিলে সাথে সাথে ফুলে লাল হয়ে যায়। আর আমরা এডিস মশার দ্বারা আক্রান্ত হয়ে মৃত্যুবরণের খবর পত্রিকায় না আসা পর্যন্ত মশার কামড়কে পাত্তাই দেইনা।

তারপরও বলতে হয়। সামাজিক দুরত্ব বজায় রেখে জরুরী প্রয়োজন ব্যাতিত বাইরে না যাওয়া এবং সচেতনতাই এই ভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার সবচেয়ে সহজ পদ্ধতি। সবাই ভাল থাকুন। ভাল থাকুক বাংলাদেশ।

লেখকঃ ড. জাকির হাওলাদার,
ডিস্ট্রিক্ট রোভার স্কাউট লিডার ( DRSL),
কক্সবাজার।

ইনভিজিবল কিলার (অদৃশ্য মৃত্যুদূত)!

ইনভিজিবল কিলার (অদৃশ্য মৃত্যুদূত) ।

মু. আমজাদ হোসেন

মাস্ক পরা যেন লোক দেখানো একটা আনুষ্ঠানিকতায় পরিণত হয়েছে চারপাশে । লোক দেখানো নয়, করোনা দেখানো । কিন্তু এই মাস্ক বাঙালিকে মোটেও করোনা থেকে রক্ষা করতে পারবে না । কোনভাবেই না ।

প্রথমত এইসব নামকাওয়াস্তের মাস্ক বিজ্ঞানসম্মত নয় । এন৯৫ নামে যে মাস্ক পরতে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিচ্ছে, এসব আমাদের ডাক্তাররাও সবাই পায় না, আমরাতো বাতিলের খাতায় । করোনা আক্রান্ত রোগি যদি কাছে এসে হাঁচি কাশি দেয়, এসব বিশ পঞ্চাশ টাকা দামের মাস্কের বাপেরও ক্ষমতা নেই আপনাকে রক্ষা করে ।

আপনি অত্যন্ত সচেতন মানুষ । আপনি ঘরের ভেতরেই থাকেন সবসময় । কিন্তু হঠাৎই মনে হলো, বাজারটা না করলেই যে চলছে না আর ।

তো, নিজস্ব পিপিই পরেই বাজারে গেলেন । বাজারে মানুষের কাছ থেকে যথেষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে বাজার করলেন, তারপর বাসায় ফিরে এলেন । কাছাকাছি কেউ হাঁচি কাশি দেয়নি । যতক্ষন বাইরে ছিলেন, মহামূল্যবান হেক্সাসল পকেট থেকে ক্ষনিক পরপর বের করে করোনাকে দেখিয়ে দেখিয়ে হাতে ঘষেছেন । বাসায় ফিরে সাবান দিয়ে আচ্ছাসে হাতমুখ ধুয়েছেন বিশ সেকেন্ডের যায়গায় এক মিনিট লাগিয়ে । আপনি কি ভাইরাসকে বিদায় করতে পেরেছেন ?

মোটেও না ।

আপনি বাজার থেকে কিনে এনেছেন ডাল, আলু, পেঁয়াজ, রসুন, লাল শাক, বরবটি, বিস্কুট, তেল, আটা, মাছ ইত্যাদি ইত্যাদি । এসবের কয়েকটি আবার নিষিদ্ধ পলিথিনে মুড়ে এনেছেন । কাঁচা বাজারে এবং মুদির দোকানে খোলা পড়ে থাকা সবজি এবং অন্যান্য খাদ্যবস্তুগুলিতে কিন্তু মাস্ক পরানো ছিল না । ওসবের গায়ে হয়তো করোনা ভাইরাস আয়েস করে বিশ্রাম নিচ্ছিল । আপনার বাজারের ব্যাগে ঢুকে কখন তারা আপনার বাড়িতে বেড়াতে চলে এসেছে আপনি তা ঘুণাক্ষরেও জানতে পারেননি ।

আপনি অতি সতর্ক মানুষ । স্বাস্থ্যবিধি নিখুঁতভাবে মেনে চলেন । তাই বাড়ি ফিরে কিছু সবজি সাবান পানিতে ধুয়ে ফেলে অদৃশ্য ভাইরাসকে বিদায় করতে পেরেছেন বলে মনে মনে যখন আত্মপ্রসাদে ভুগছেন, করোনা ভাইরাস তখন আটা কিংবা বিস্কুটের প্যাকেটে, কিংবা পেঁয়াজের লাল শরীরে বসে খিক খিক করে হাসছে ।

ওদিকে আপনার স্ত্রী বাজার থেকে আনা যে পলিথিনগুলি ফ্রিজে মাছ-মাংশ সংরক্ষন করবে বলে ভাঁজ করে রান্নাঘরে গুঁজে রাখছে, সেগুলিতে বসে তক্কে তক্কে ছিল ভাইরাস । চান্স পেয়েই আপনার স্ত্রীর নরম হাতটা তার অজান্তেই খপ করে ধরে বসেছে ।

আপনি পকেট থেকে টাকাগুলি বের করে সাবান পানিতে ধুয়ে ফেলেননি নিশ্চয়? অসংখ্য হাত ঘুরে আসা নোংরা টাকাগুলির গায়ে হয়তো বহু করোনা ভাইরাস মিটিং করছে । আপনি পকেট থেকে বের করে রেখে দিলেন আলমারিতে । ভাবলেন, যাক্, ভাইরাস এখন আলমারিতে বন্দি ।

সাবধানের মার নেই । কাপড়ে কিছু ভাইরাস লেগে থাকতে পেরে ভেবে বাথরুমে ছুঁড়ে ফেললেন সব । ভালো । কিন্তু আপনি ভুলে গেছেন রাস্তা-ঘাটের রাজ্যের করোনা মেশানো থুতু আর হাঁচি কাশি মাড়িয়ে আসা আপনার চামড়ার স্যান্ডেল জোড়াকে বাথরূমে ছুঁড়ে ফেলতে ।

সাবান দিয়ে হাত ধুয়েছেন, মুখ ধুয়েছেন, মাস্ক ধুয়েছেন, কাপড় ধুয়েছেন, খাদ্যবস্তুগুলি ধুঁয়েছেন, পলিথিনগুলি ফেলে দিয়েছেন, স্যানিটাইজারে ঘর মুছে ফেলেছেন, স্ত্রীর হাতেও ছিল স্যানিটাইজার লাগানো । করোনা ভাইরাস আপনার টিকিটিরও নাগাল পায় নি । খামোকাই বকেছি এতক্ষন ।

গোসল করে ফ্রেশ হয়ে বিছানায় বসে ফ্যান ছেড়ে দিয়ে বিশ্বের করোনা পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে বাজার থেকে দশ টাকায় কিনে আনা পত্রিকাটা বিছানায় খুলে বসেছেন । আরাম করবেন ।

আপনার পত্রিকার পাতায় করোনার খবর নয়, সত্যিকারের করোনা ভাইরাস বসে বসে ঝিঁমুচ্ছিল কয়েক ঘন্টা ধরে । এখন শিকারকে এত কাছে দেখতে পেয়ে সে খুশিতে অট্টহাসি দিয়ে উঠেছে ।

আপনার এক জোড়া কানের ক্ষমতা নেই এত কম ফ্রিকোয়েন্সির অট্টহাসি কোনদিন শুনবে ।

লেখকঃ মু. আমজাদ হোসেন,
সহঃ অধ্যাপক, ইংরেজি, কফিল উদ্দিন বিশ্ববিদ্যালয় কলেজ, লক্ষ্মীপুর ।

কোন জিনিসে কতদিন বেচে থাকে করোনা ভাইরাস?

কোন জিনিসে কতদিন বেঁচে থাকে করোনাভাইরাস?

বিশ্বব্যাপী এখন কাঁপছে করোনাভাইরাস আতঙ্কে। এরই মধ্যে প্রাণঘাতী ভাইরাসটি ছড়িয়ে পড়েছে ১৯৯ দেশ ও অঞ্চলে। এর থাবায় গোটা বিশ্বে এখন পর্যন্ত আক্রান্ত হয়েছে ৭ লাখ ২১ হাজার মানুষ। মৃত্যু হয়েছে প্রায় ৩৪ হাজার মানুষের।

করোনাভাইসরাস নিয়ে সারা বিশ্ব শঙ্কিত। যারা সচেতন এবং সংক্রমণ রুখতে চিকিৎসকের পরামর্শ মেনে চলছেন, তারা ঘন ঘন হাত ধুয়ে নিচ্ছেন। বাইরে বের হতে হলে মাস্ক পরে নিচ্ছেন।

কিন্তু কোন জিনিসে এই ভাইরাস কতদিন বাঁচে? কোনও জিনিসের সংস্পর্শে কোনও আক্রান্ত রোগী এলে, কতদিন পর্যন্ত সেই জিনিস থেকে সাবধানতা অবলম্বন করা উচিত?

দেখা গেছে, করোনাভাইরাস সবচেয়ে বেশি দিন বাঁচতে পারে পলিপ্রোপিলিনের ওপর। পাঁচ দিন পর্যন্ত এর উপর বেঁচে থাকতে পারে করোনাভাইরাস।

পলিপ্রোপিলিন এক ধরনের প্লাস্টিক। এই ধরনের প্লাস্টিক দিয়েই বাচ্চাদের খেলনা থেকে শুরু করে প্লাস্টিকের টিফিন বক্স তৈরি করা হয়।

দ্বিতীয় যে জিনিসের উপর করোনাভাইরাস বেশি ক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে, তা হল কাগজ।

তবে প্রথমেই বলে রাখা দরকার, গবেষকরা জানিয়েছেন, খবরের কাগজ থেকে কোনওভাবেই এই ভাইরাস ছড়াতে পারে না। পশ্চিমবঙ্গের যাদবপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রিন্টিং ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক কানাইচন্দ্র পাল বলছেন, ‘‘কাগজের মাধ্যমে এই সংক্রমণ ছড়ানোর কোনও আশঙ্কাই নেই। কাগজ যা দিয়ে তৈরি, বিশেষ করে সংবাদপত্রের প্রক্রিয়াকরণের সময়ে যে সমস্ত রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়, তার উপরে ড্রপলেটের বেঁচে থাকা অসম্ভব। ’’
তবে গবেষকেরা জানিয়েছেন, খবরের কাগজ ছাড়া অন্যান্য কাগজের উপর ৪-৫ দিন বেঁচে থাকতে পারে করোনাভাইরাস।

তৃতীয় যে জিনিসের উপর করোনাভাইরাস বেশি ক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে, তা হল কাচ। গবেষণায় দেখা গেছে, কাচ জাতীয় কোনও জিনিসের উপর অন্তত চার দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে করোনাভাইরাস।

ফলে কাচে হাত দিলে, নিয়ম-বিধি মেনে ভাল করে হাত পরিষ্কার করে নেওয়া প্রয়োজন। বাড়ির জানলার কাচগুলো প্রয়োজনে ভাল করে ধুয়ে পরিষ্কার করা দরকার।

একই ভাবে কাচের মতো সমান সংক্রমণযোগ্য হল কাঠ। কাঠের বস্তুর উপর এই ভাইরাস চার দিন পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

তাই গবেষকেরা জানান, কাঠের কোনও বস্তুতে হাত দিলে, তার পরই যেন কোনওভাবেই হাত মুখে বা নাকে না যায় এবং ভাল করে ২০ সেকেন্ড ধরে সাবান দিয়ে হাত ধুয়ে ফেলা জরুরি।

এর পর যে জিনিসের উপর করোনাভাইরাস বেশি ক্ষণ বেঁচে থাকতে পারে, তা হল স্টেইনলেস স্টিল। গবেষণায় দেখা গেছে, স্টেইনলেস স্টিলের উপর এই ভাইরাস ৪৮ ঘণ্টা পর্যন্ত সক্রিয় থাকে।

কোনও আক্রান্ত ব্যক্তির হাঁচি-কাশির মাধ্যমে যদি করোনাভাইরাসের জীবাণু ড্রপলেটের মাধ্যমে কোনও স্টিলের উপরে পড়ে, তাহলে ৪৮ ঘণ্টা পরও তা থেকে সংক্রমণ ছড়াতে পারে।

সার্জিক্যাল গ্লাভস। প্রধানত চিকিৎসকেরা এই গ্লাভস ব্যবহার করে থাকেন। এই গ্লাভস ব্যবহারে ভীষণভাবে সুরক্ষা-বিধি মেনে চলা প্রয়োজন। কারণ সার্জিক্যাল গ্লাভসের উপর এই ভাইরাস অন্তত চার ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে। সুরক্ষা-বিধি মেনে না চললে, সংক্রমণ ছড়ানোর সম্ভাবনাও খুব বেশি।

যে কতগুলো ধাতব বস্তু নিয়ে গবেষণা চালানো হয়েছে। তার মধ্যে আরেকটি হল অ্যালুমিনিয়াম। গবেষকরা জানান, অ্যালুমিনিয়ামের উপর এই ভাইরাস দু’ঘণ্টা থেকে চার ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে।

তবে ‘নগ্ন’ ভাইরাস কোনও কিছুর উপরই বাঁচতে পারে না। এদের টিকে থাকার জন্য ড্রপলেটের প্রয়োজন হয়। অ্যালুমিনিয়াম জাতীয় পদার্থের উপর যদি এই ড্রপলেট পড়ে, তবেই তা সংক্রমণযোগ্য।

এগুলো ছাড়া সম্প্রতি নিউ ইংল্যান্ড জার্নাল অব মেডিসিন একটি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে। তাতে তামার উপর এবং বাতাসে এই ভাইরাস কতদিন বাঁচতে পারে, তা প্রকাশ করা হয়েছে।

সেই রিপোর্ট অনুযায়ী, তামার উপর চার ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকতে পারে এই করোনাভাইরাস। আর বাতাসে মাত্র তিন ঘণ্টা পর্যন্ত বেঁচে থাকে।

সূত্র: আনন্দবাজার/বিডি প্রতিদিন/কালাম