বিশ্বের প্রথম বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিষ্ঠাতা মুসলিম নারী ফাতিমা আল ফিহরি

ইঞ্জিনিয়ার মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা

আধুনিক বিশ্বের সবচেয়ে নামকরা দুটি বিশ্ববিদ্যালয় ক্যামব্রিজ এবং অক্সফোর্ড প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল যথাক্রমে ১২০৯ এবং ১০৯৬ সালে। তবে পুরো বিশ্বের তো বটেই, এগুলোর কোনোটিই ইউরোপেরও প্রথম বিশ্ববিদ্যালয় ছিল না। ইউরোপের সবচেয়ে প্রাচীন বিশ্ববিদ্যালয়, ইতালির বোলোগনা বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল ১০৮৮ সালে। তারও প্রায় একশ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মিসরের আল-আজহার বিশ্ববিদ্যালয়।

কিন্তু আল-আজহারেরও প্রায় একশ অনেক আগে, আজ থেকে প্রায় সাড়ে এগারোশ’ বছর আগে প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল মরক্কোর কারাউইন ইউনিভার্সিটি। ইউনেস্কো এবং গিনেজ বুক অফ ওয়ার্ল্ডের রেকর্ড অনুযায়ী এটিই হচ্ছে বিশ্বের প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয় এবং ডিগ্রী প্রদানকারী প্রতিষ্ঠান, যা এখন পর্যন্ত একটানা চালু আছে। আর এই ঐতিহাসিক বিশ্ববিদ্যালয়টি প্রতিষ্ঠা করেছিলেন একজন মুসলিম নারী, ফাতিমা আল-ফিহরি!

ফাতিমা আল-ফিহরির জন্ম আনুমানিক ৮০০ খ্রিস্টাব্দের কাছাকাছি সময়ে, বর্তমানকালের তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরে। তার পুরো নাম ফাতিমা বিনতে মুহাম্মাদ আল-ফিহরিয়া আল-কুরাইশিয়া। তাদের পারিবারিক নামের কুরাইশিয়া অংশ থেকে ধারণা করা হয় তারা ছিলেন কুরাইশ বংশের উত্তরাধিকারী।

তিউনিসিয়ার কাইরাওয়ান শহরটির গোড়াপত্তন হয়েছিল উমাইয়া শাসকদের হাতে, ৬৭০ খ্রিস্টাব্দে। নবম শতকের শুরুর দিকে শহরটি হয়ে উঠেছিল ইসলামী শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। সামরিক দিক থেকেও শহরটি ছিল গুরুত্বপূর্ণ ঘাঁটি। কিন্তু তা সত্ত্বেও এই শহরে বসবাসরত আল-ফিহরি পরিবারসহ অনেকেই ছিল আর্থিকভাবে অসচ্ছল। ফলে ফাতিমার জন্মের কয়েক বছর পর নবম শতকের শুরুর দিকে কাইরাওয়ান শহরের বেশ কয়েকটি পরিবার একত্রে শহরটি ছেড়ে ভাগ্যের অন্বেষণে পাড়ি জমায় ইসলামিক মাগরেবের প্রসিদ্ধ শহর, মরক্কোর ফেজের উদ্দেশ্যে।

ফেজ ছিল তখন ক্রমবর্ধমান কসমোপলিটন শহর। নানা দেশ থেকে নানা ধর্ম, বর্ণ ও পেশার মানুষ সেখানে এসে বসতি স্থাপন করছিল। সে সময় ফেজের শাসক ছিলেন সুলতান দ্বিতীয় ইদ্রিস। তিনি ছিলেন অত্যন্ত ধর্মপ্রাণ মুসলমান এবং ন্যায়পরায়ণ শাসক। বিদেশ থেকে আগত অভিবাসীদেরকে তিনি ফেজ নদীর তীরের ঢালু জমিতে বসবাস করার ব্যবস্থা করে দেন। কাইরাওয়ান থেকে আসার কারণে ফেজে বসতি গড়া এই অভিবাসীদের পরিচয় হয় কারাউইন, তথা কাইরাওয়ানের অধিবাসী নামে।

ফেজে এসে মোহাম্মদ আল-ফিহরির ভাগ্য খুলে যায়। প্রচণ্ড পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি নিজেকে একজন সফল ব্যবসায়ী হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেন। তার সন্তানদের জন্য তিনি সুশিক্ষার ব্যবস্থা করেন। ফাতিমা আল-ফিহরি এবং তার বোন মারিয়াম আল-ফিহরি ক্লাসিকাল আরবি ভাষা, ইসলামিক ফিক্‌হ এবং হাদিস শাস্ত্রের উপর পড়াশোনা করেন।

প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পর এই ফেজ শহরেই ফাতিমার বাবা তাকে বিয়ে দেন। কিন্তু বিয়ের কয়েক বছরের মাথায়ই ফাতিমাদের পরিবারে দুর্যোগ নেমে আসে। অল্প সময়ের মধ্যেই তার বাবা, ভাই এবং স্বামী মৃত্যুবরণ করেন। রয়ে যান কেবল এতিম দুই বোন ফাতিমা এবং মারিয়াম। বাবার রেখে যাওয়া বিপুল পরিমাণ সম্পত্তির উত্তরাধিকার হন তারা।

মুসলিম উত্তরাধিকার আইন অনুযায়ী পিতার কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি ব্যয় করার ক্ষেত্রে কন্যারা কারো কাছে জবাবদিহি করতে বাধ্য না। ফাতিমা এবং মারিয়ামও চাইলে এই সম্পত্তি যেকোনোভাবে ব্যয় করতে পারতেন। কিন্তু কোনো বিলাসিতার পেছনে ব্যয় না করে তারা সিদ্ধান্ত নেন, এই অর্থ তারা ব্যয় করবেন ধর্মের জন্য, মানবতার কল্যাণের জন্য। সাজসজ্জার কিংবা বিলাসিতার পণ্য ক্রয় না করে সিদ্ধান্ত নেন, তারা ক্রয় করবেন জনগণের ভবিষ্যত।

ফেজের খ্যাতি তখন দিনে দিনে বেড়েই চলছিল। দেশ-বিদেশ থেকে মুসল্লিরা এসে শহরটিতে বসবাস করতে শুরু করছিল। ফাতিমা এবং মারিয়াম লক্ষ্য করেন, ফেজের কেন্দ্রীয় মসজিদটি শহরের ক্রমবর্ধমান মুসল্লিদেরকে আর স্থান দিতে পারছে না। ফলে তারা সিদ্ধান্ত নেন, বাবার রেখে যাওয়া সম্পত্তি দিয়ে তারা পৃথক দুটি মসজিদ নির্মাণ করবেন। প্রায় কাছাকাছি সময় দুই বোন কাছাকাছি এলাকায় দুটি পৃথক মসজিদ নির্মাণ করেন। মারিয়াম নির্মাণ করেন আন্দালুস মসজিদ, আর ফাতিমা নির্মাণ করেন কারাউইন মসজিদ।

ফাতিমা সম্পর্কে খুব বেশি তথ্য জানা যায় না, এমনকি তার প্রতিষ্ঠিত কারাউইন লাইব্রেরিতেও না। ধারণা করা হয়, তার উপর লিখিত পাণ্ডুলিপিগুলো কারাউইন লাইব্রেরির ১৩২৩ সালের ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নষ্ট হয়ে গেছে। সবচেয়ে পুরাতন যে উৎসে ফাতিমার বিবরণ পাওয়া যায়, সেটি হলো চতুর্দশ শতকের ইতিহাসবিদ ইবনে আবি-জারার লেখা ফেজ শহরের ইতিহাস, The Garden of Pages। পরবর্তীতে বিখ্যাত ইতিহাসবিদ ও সমাজবিজ্ঞানী ইবনে খালদুনও ফাতিমার কথা লিখেছেন, কিন্তু তাতে ইবনে আবি-জারার বর্ণনাই প্রতিধ্বনিত হয়েছে।

ইবনে আবি-জারার বিবরণ থেকে জানা যায়, ফাতিমা প্রথমে তার মসজিদ নির্মাণের জন্য জমি ক্রয় করতে শুরু করেন এবং এরপর ৮৫৯ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরের ৩ তারিখে মসজিদ নির্মাণের কাজ শুরু করেন। সেটা ছিল পবিত্র রমজান মাসের এক শনিবার। ফাতিমা শুধু মসজিদ নির্মাণের জন্য অর্থ দান করেই নিজের দায়িত্ব শেষ করেননি। তিনি নিজে সার্বক্ষণিকভাবে উপস্থিত থেকে এর নির্মাণকাজ তদারকি করেছিলেন। এবং শুরুর দিন থেকে শুরু করে নির্মাণ শেষ হওয়া পর্যন্ত প্রতিটি দিন তিনি রোযা রেখেছিলেন।

কিছু বর্ণনা অনুযায়ী, মসজিদটির নির্মাণ সম্পন্ন হতে সময় লেগেছিল ১৮ বছর, যদিও অন্য কিছু বর্ণনা থেকে ১১ বছর এবং ২ বছরের বর্ণনাও পাওয়া যায়। যেদিন নির্মাণ শেষ হয়, সেদিন তিনি নিজের নির্মিত মসজিদের ভেতরে প্রবেশ করে নামাজ আদায় করেন এবং আল্লাহ্‌র প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন। জন্মভূমি কাইরাওয়ানের নামানুসারে তিনি মসজিদটির নাম রাখেন কারাউইন মসজিদ।

মসজিদ নির্মাণ সম্পন্ন হওয়ার পর ফাতিমা মসজিদের বর্ধিতাংশে একটি মাদ্রাসা নির্মাণ করেন। অল্পদিনের মধ্যেই সেখানে ইসলামী শিক্ষার পাশাপাশি ব্যাকরণ, গণিত, চিকিৎসাশাস্ত্র, জ্যোতির্বিদ্যা, ইতিহাস, রসায়ন, ভূগোলসহ বিভিন্ন বিষয়ে পাঠদান শুরু হয়। বিভিন্ন বৈচিত্র্যময় বিষয়ের উপর আনুষ্ঠানিক শিক্ষার জন্য ডিগ্রী প্রদানকারী শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যেই এটিই প্রাচীনতম, যা এখনও টিকে আছে এবং গত সাড়ে এগারোশ’ বছর ধরে একটানা শিক্ষা প্রদানের মাধ্যমে মানুষকে আলোকিত করে আসছে।

ফাতিমা আল-ফিহরির প্রতিষ্ঠিত কারাউইন মসজিদটি দীর্ঘদিন পর্যন্ত সমগ্র উত্তর আফ্রিকার বৃহত্তম মসজিদ ছিল। তার মৃত্যুর পর ৯১৮ সালে সরকার মসজিদটিকে অধিগ্রহণ করে এবং একে সরকারি মসজিদ হিসেবে ঘোষণা করে, যেখানে সুলতান নিয়মিত নামাজ আদায় করতে শুরু করেন। দ্বাদশ শতকের দিকে পুনরায় পরিবর্ধনের পর এটি একসাথে ২২,০০০ মুসল্লিকে ধারণ করার সক্ষমতা অর্জন করে।

ফাতিমার প্রতিষ্ঠিত কারাউইন মসজিদ এবং কারাউইন ইউনিভার্সিটিকে কেন্দ্র করে ফেজ হয়ে উঠতে থাকে আফ্রিকার ইসলামী শিক্ষার প্রধান কেন্দ্র। শুধু মুসলমান না, মধ্যযুগের অনেক খ্যাতিমান ইহুদি এবং খ্রিস্টান মনীষীও এই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পাশ করে বেরিয়েছেন। এর ছাত্রদের মধ্যে একজন ছিলেন পোপ দ্বিতীয় সিলভাস্টার, যিনি এখান থেকে আরবি সংখ্যাপদ্ধতি বিষয়ে ধারণা লাভ করে সেই জ্ঞান ইউরোপে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন এবং ইউরোপীয়দেরকে প্রথম শূন্যের (০) ধারণার সাথে পরিচিত করেছিলেন। এই বিশ্ববিদ্যালয়ে বিভিন্ন সময়ে শিক্ষকতার সাথে যুক্ত ছিলেন বিখ্যাত মালিকি বিচারপতি ইবনে আল-আরাবি, ইতিহাসবিদ ইবনে খালদুন এবং জ্যোতির্বিদ নূরুদ্দীন আল-বিতরুজি। প্রতিষ্ঠার পরপর ফাতিমা নিজেও কিছুদিন এখানে অধ্যয়ন করেছিলেন।

কারাউইন ইউনিভার্সিটির লাইব্রেরিটিকেও বিশ্বের প্রাচীনতম লাইব্রেরি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। আগুনে পুড়ে বিপুল সংখ্যক পাণ্ডুলিপি নষ্ট হয়ে যাওয়ার পরেও এখনও এতে প্রায় ৪,০০০ প্রাচীন এবং দুর্লভ পাণ্ডুলিপি আছে। এর মধ্যে আছে নবম শতকে লেখা একটি কুরআন শরিফ, হাদিসের সংকলন, ইমাম মালিকের গ্রন্থ মুয়াত্তা, ইবনে ইসহাকের লেখা রাসুল (সা)-এর জীবনী, ইবনে খালদুনের লেখা কিতাব আল-ইবার এবং আল-মুকাদ্দিমার মূল পাণ্ডুলিপিসহ বিভিন্ন দুষ্প্রাপ্য গ্রন্থ।

ফাতিমা আল-ফিহরি ইন্তেকাল করেন ৮৮০ খ্রিস্টাব্দে। কিন্তু তার প্রতিষ্ঠিত কারাউইন মসজিদ, ইউনিভার্সিটি এবং লাইব্রেরি আজও দাঁড়িয়ে আছে সগৌরবে। তার প্রতিষ্ঠিত বিশ্ববিদ্যালয় থেকে গত সহস্রাধিক বছরে লক্ষাধিক শিক্ষার্থী পাশ করে বেরিয়েছে। তার স্বদেশী আরব, মুসলিম বিশ্ব এবং সর্বোপরি মানব সম্প্রদায়কে জ্ঞানের আলোয় আলোকিত করার ক্ষেত্রে এবং বিশ্বের জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে ফাতিমার অবদান অপরিসীম।

লেখকঃ ইঞ্জিনিয়ার মোজাম্মেল হোসেন ত্বোহা,  ত্রিপোলি, লিবিয়া থেকে।

ক্রেডিট -Roar Bangla

ঈদের পরে এইচএসসি পরীক্ষা, অবস্থা বুঝে এসএসসির ফলাফল

করোনা পরিস্থিতিতে শিক্ষা কার্যক্রম এগিয়ে নিতে দফায় দফায় মিটিং করছেন মন্ত্রী-সচিবসহ শিক্ষা কর্মকর্তারা। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগের সচিব সব বোর্ডের চেয়ারম্যানদের সঙ্গে ভিডিও কনফারেন্স করেছেন।

শিক্ষা বোর্ডগুলোর পরীক্ষা শেষ হওয়ার ৬০ দিনের মধ্যে ফল প্রকাশের একটি রীতি চালু হয়েছে। এই রীতি অনুযায়ী বিগত ১০ বছর জেএসসি ও সমমান, এসএসসি ও সমমান, এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষাসহ সব পাবলিক পরীক্ষার ফল প্রকাশ করা হচ্ছে। করোনা পরিস্থিতির কারণে দীর্ঘদিনের রীতিতে এবার ব্যত্যয় ঘটেছে। ভাইরাসের সংক্রমণ এড়াতে সরকার সারাদেশে যোগাযোগ ব্যবস্থা বন্ধ রেখেছে। এ কারণে মাঠ পর্যায়ে পাঠানো শিক্ষার্থীদের উত্তরপত্রের মূল্যায়ন শেষে নম্বরপত্র (ওএমআর শিট) বোর্ডে পৌঁছাতে পারছেন না শিক্ষকরা। যার কারণে এবার অন্যান্য বারের ন্যায় যথাসময়ে ফলাফল প্রদান সম্ভব হবেনা। তবে আন্তঃশিক্ষা বোর্ড সমন্বয় সাব-কমিটির সভাপতি ও ঢাকা শিক্ষা বোর্ডের চেয়ারম্যান মু. জিয়াউল হক বলেন, গণপরিবহন যখন সীমিত আকারে চলাচল শুরু হবে, তার ১৫ দিনের মধ্যে প্রকাশ করব।

একাদশের ভর্তির বিষয়ে তিনি বলেন, ফলাফলের পরে যথারীতি চেষ্টা করব এক মাসের মধ্যে ভর্তি শেষ করে ক্লাস শুরু করার। আর বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ক্লাস মিস হলে আগামী বছরে যে ছুটির তালিকা আছে, তার সঙ্গে সমন্বয় করার চেষ্টা করব।

এদিকে গত ১ এপ্রিল থেকে এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষা শুরু হওয়ার কথা থাকলেও করোনা পরিস্থিতির কারণে নির্ধারিত সময়ে পরীক্ষা শুরু করা যায়নি। আন্তঃশিক্ষা বোর্ডের সভাপতি জিয়াউল হক বলেন, আমরা পরিস্থিতি দেখে রুটিন করব ২৪ থেকে ২৫ এপ্রিলের দিকে। যাতে ঈদের চার থেকে পাঁচ দিন পরে পরীক্ষা নিতে পারি। তবে সব নির্ভর করছে পরিস্থিতির ওপর।

জীবনের ফাইনাল হুইসেল কি বেজে গেছে?

আমরা হতাশ কেন? জীবনের ফাইনাল হুইসেল কি বেজে গেছে?

ড. মোঃ কামাল উদ্দিন

লকডাউনের মধ্যে আমার দৈনিক অনেকগুলো কাজের মধ্যে একটি কাজ হচ্ছে আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের খোঁজখবর নেয়া। এর অংশ হিসেবে আজ কয়েকজনকে কল করলাম। বেশিরভাগের মধ্যে হতাশা! জীবন নিয়ে হতাশা! সংশয়! ভয়! প্রচন্ড মানসিক চাপ! অনেকেই সারাদিন শুয়ে বসে কাটাচ্ছেন। কোন কাজই করছেন না । বলছেন, কি আর হবে কাজ করে! কি হবে ক্ষেত খামার করে! মানুষই বাঁচবে না! কোন উত্সাহ-উদ্দীপনা নেই। এরকম কথা শুনে আমিও কিছুটা নিরুৎসাহিত হয়ে গেলাম! কিছুক্ষণ পর একটি গল্প মনে পড়ে গেল। একটু শেয়ার করি। যারা বেশি নিরুৎসাহিত ও এই মুহূর্তে হতাশ তাদের কাজে লাগতে পারে।

একজন লোক স্কুলের খেলার মাঠে স্থানীয় ফুটবল ম্যাচ দেখছিলেন। ওনার পাশে বসা ছিল অনেকগুলো স্কুলের শিক্ষার্থী। তিনি একজনকে জিজ্ঞেস করলেন, খেলার স্কোর কী? একজন শিক্ষার্থী মুখে উজ্জ্বল হাসি নিয়ে উত্তর দিল, আমাদের প্রতিপক্ষ দল আমাদের‌ থেকে ৩ গোলে এগিয়ে আছে। লোকটি অবাক হলেন! ছেলেটিকে জিজ্ঞেস করা হলো তোমার দল হেরে যাচ্ছে কিন্তু তুমি নিরুৎসাহিত নও! তোমাকে হতাশ দেখাচ্ছে না! ছেলেটি আবার হাসতে হাসতে উত্তর দিল, জনাব, আমরা কেন হতাশ হবো, নিরুৎসাহিত হবো, রেফারি তো এখনো চূড়ান্ত হুইসেলটি বাজাননি। দেখুন আমার দল ও ম্যানেজারের প্রতি আমার আস্থা আছে, আমরা অবশ্যই ম্যাচটি জিতবো। অবশেষে ছেলেটির দল ৫/৪ গোলে জয় লাভ করলো। ছেলেটি চলে যাওয়ার সময় একটি কোমল হাসি দিয়ে লোকটির দিকে আলতো করে হাত নেড়ে চলে গেল। লোকটি পুরোপুরি বিস্মিত হলেন! কী আত্মবিশ্বাস! এত দারুন বিশ্বাস!সে কেবল একটি ছোট্ট ছেলে!

আমার মনে ছেলেটির প্রশ্নটি বার বার বেজে উঠলো। কেন আমরা হতাশ হবো! আমাদের জীবনের রেফারি ফাইনাল হুইসেলটিতো এখনও ফুঁকেননি, বাজাননি?

আসুন, জীবন হল ঠিক খেলার মতো।
আমাদের অর্থবহ বন্ধু ও পরিবার আছে, আমরা কেন নিরুৎসাহিত হবো।আমাদের একজন স্রষ্টা আছেন যার শক্তি অসীম, তিনি আমাদের সহায়তা করেন, আমাদের রক্ষা করেন, করবেন, ক্ষমা করেন ও করবেন। তাহলে আমরা কেন হতাশ? আমরা কেন নিরুৎসাহিত? এখনও জীবন বাকি আছে, চূড়ান্ত হুইসেলটি এখনও বাজানো হয়নি, যতক্ষণ জীবন থাকে কতক্ষণ কিছুই অসম্ভব নয়।আসলে, অনেক মানুষ তার জীবনের চূড়ান্ত হুসেলটি তিনি নিজেই বাজিয়ে ফেলতে চান। তিনি নিজেই মরার আগে মরে যান বা যেতে চান।

প্লিজ ঘরে থাকুন, বের হবেন না, সামাজিক ও মানসিক নয়, শারীরিক দূরত্ব মেনে চলুন, আত্মবিশ্বাস রাখুন, সৃষ্টিকর্তার উপর বিশ্বাস ও আস্থা রাখুন, তিনিতো এখনো ফাইনাল হুইসেল বাজানোর নির্দেশ দেননি। আপনি নিজে নিজে আপনার জীবনের ফাইনাল হুইসেল বাজাবেন না প্লিজ।

ড. মো. কামাল উদ্দিন: প্রফেসর ও সাবেক চেয়ারম্যান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়।

করোনা আক্রান্তের চিহ্ন এখন পায়েও

সারা বিশ্বে এখন করোনা আতঙ্ক। পৃথিবী জুড়ে করোনায় আক্রান্তের সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা হু হু করে বাড়ছে। করোনাভাইরাসে আক্রান্ত হলে সাধারণ কয়েকটি লক্ষণ দেখা দেয়। প্রথমে শুকনো কাশি ও জ্বর লক্ষ্য করা যায়। পরে এই মারণ ভাইরাস ফুসফুসে আক্রমণ করে।

করোনা নিয়ে প্রতিদিনই নতুন নতুন তথ্য জানাচ্ছেন গবেষকরা। এমনকি গবেষকরা জানান, কোনো লক্ষণ দেখা দেওয়া ছাড়াও যেকোনো ব্যক্তি করোনায় আক্রান্ত হয়ে থাকতে পারেন। আর এবার বলা হচ্ছে, পায়েও দেখা দিতে পারে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার চিহ্ন।

গবেষকদের মতে, আঘাতের চিহ্নের মতো দেখা দিতে পারে করোনায় আক্রান্ত হওয়ার চিহ্ন। পায়ের আঙুলে আঘাত পাওয়ার পর যেমন অবস্থা দেখা দেয়, করোনায় আক্রান্ত হলেও তেমন আকার ধারণ করতে পারে।
স্পেনেরর চিকিৎসা বিশেষজ্ঞরা বর্তমানে তদন্ত করছেন এই বিষয়টি নিয়ে। যাদের মধ্যে ভাইরাস রয়েছে তাদের পায়ে ক্ষুদ্র ক্ষত চিহ্ন বা আঘাতের চিহ্নের মতো কিছু রয়েছে কিনা তা খতিয়ে দেখছেন তারা।

গত বৃহস্পতিবার স্পেনের জেনারেল কাউন্সিল অব অফিশিয়াল পডিয়েট্রিস্ট (পায়ের যত্নের বিশেষজ্ঞ) কলেজ একটি বিবৃতি শেয়ার করেছে। সেখানে বলা হয়, বেশ কয়েক জন করোনাভাইরাসের আক্রান্ত রোগীর পায়ে ক্ষত রয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়েছে, করোনায় আক্রান্ত রোগীদের পায়ে কয়েকটি চিহ্ন পাওয়া গেছে। এগুলো দেখতে বেগুনি বর্ণের আঘাতের চিহ্ন ও ক্ষতের মতো। চিকেনপক্স, হাম বা চিলব্লেনের সাথে খুব মিল রয়েছে এসব চিহ্নের। সাধারণত পায়ের আঙুলের ওপর এগুলো দেখা গেছে। তবে কোনো রকম চিহ্ন না রেখেই এগুলো আবার ভালো হয় যায়।

বিবৃতিতে আরো বলা হয়েছে, এটি এক ধরনের কৌতূহলী আবিষ্কার। চর্ম বিশেষজ্ঞ ও পোডিয়াট্রিস্টদের মতে, ইতালি ও ফ্রান্সের পাশাপাশি স্পেনের অসংখ্য কভিড-১৯ রোগীর মধ্যেও এই ক্ষত চিহ্ন লক্ষ্য করা গেছে।

করোনায় আক্রান্ত কিশোর ও শিশুসহ অল্প বয়স্ক ব্যক্তিদের মধ্যে এই ক্ষতগুলো বেশি দেখা গেছে। তবে কয়েক জন প্রাপ্তবয়স্কদের মধ্যেও এগুলো ছিল। এই বিয়ষটি নিয়ে বিস্তর গবেষণা করা হবে বলে জানানো হয়েছে বিবৃতিতে।

করোনা আক্রান্তের পায়ের চিহ্নটি প্রথম ধরা পরে ১৩ বছর বয়সী এক কিশোরের শরীরে। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হয়েছিল, কিশোরটির পায়ে হয়তো মাকড়সা কামড়েছিল। কিন্তু কয়েক দিন পরই তার মধ্যে করোনার লক্ষণ দেখা দিতে শুরু করে। এরপর বিষয়টি নজরে আসে গবেষকদের।

ছাত্র-ছাত্রীদের জন্য লেখাটি ‘দৈনিক শিক্ষা’র সৌজন্যে

কোন দিকে যাচ্ছে করোনা পরিস্থিতি, ২৭ ডক্টর ও ১০ নার্স আক্রান্ত

বাংলাদেশের চিকিৎসকদের একটি সোস্যাল প্লাটফর্ম “বাংলাদেশ ডক্টরস ফাউন্ডেশন” বা বিডিএফ পেইজে দেখলাম এখন পর্যন্ত বাংলাদেশে ২৭জন ডাক্তার করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত হয়েছেন। আর ৮৭ জন হোম কোয়ারেন্টিনে রয়েছেন। বিডিএফের প্রতিষ্ঠাতা ডাক্তার নিরুপম দাস বলেন, এত অল্প সময়ে বেশি সংখ্যক ডাক্তারের করোনা আক্রান্ত হওয়া খারাপ সংবাদ। কেননা ডাক্তাররা নিরাপদ না থাকলে চিকিৎসা প্রদান করবেন কারা। এ ব্যাপারে সরকারের যথাযথ পদক্ষেপ দাবি করেন তিনি।
তিনি আরোও বলেন, এই যে প্রায় ৮৭ জন ডাক্তারসহ স্বাস্থ্যকর্মী হোম কোয়ারেন্টিনের পথে,এটা একটা খারাপ সংবাদ। আরো খারাপ যে এতগুলো ডাক্তার কয়দিনে কতজন রুগীর গায়ে হাত দিয়েছেন সেটার কোন হদিস নেই।

ডাক্তার নিরুপম দাস মারফত জানা যায়, ঢাকা মেডিকেলের সার্জারি ইউনিট-৫ লকডাউনের প্রসেসিং চলছে,৯ জন ডাক্তারসহ ১৬ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে। পেট ব্যথার একজন রোগী তথ্য গোপন করে ভর্তি হয়েছিল,পরবর্তিতে যার করোনা টেস্ট পজিটিভ এসেছে। এ কারণে ৯ জন ডাক্তারসহ ১৬ জন স্বাস্থ্যকর্মীকে হোম কোয়ারেন্টিনে পাঠানো হয়েছে।

নিরুপম দাস সব ডাক্তারের জন্য সঠিক পিপিই নিশ্চিত করা এবং প্রতিটি জেলায় আলাদা করে ৪/৫ টা ওয়েল সেটআপ সহ ফিবার ক্লিনিক/ফ্লু কর্নারের ব্যবস্থা করার দাবি করেছেন। তার মতে, এটা দাবি নয়, দেশের মানুষের ভালোর জন্য এটা করা উচিত।

ব্যাতিক্রমি বাংলা নববর্ষ, দেশের সকল ছাত্র-ছাত্রীকে শুভেচ্ছা

সায়েদ কবির, চঃবিঃ

বাঙালির পহেলা বৈশাখ মানেই পান্তা-ইলিশ, পহেলা বৈশাখ মানেই বৈশাখী মেলার আরম্ভরপূর্ণ আয়োজন। করোনা পরিস্থিতির কারণে সেসবই আজ কল্পনা । কথা ছিলো আজ বাইরে দলে দলে আনন্দোৎসবে মেতে উঠবে বাঙালি কিন্তু এবার একাকি কিংবা ঘরের সদস্যদের নিয়েই পালন করতে হচ্ছে বাংলা নববর্ষ। প্রাণঘাতি করোনোর কারণে পুরো দেশ আজ লকডাউন অবস্থা বিরাজ করছে। মরণঘাতী করোনাভাইরাসের থেকে মুক্ত থাকতে পারাটাই যেনো এসময়ের সবচেয়ে বেশী আনন্দের বিষয়।

প্রিয় ছাত্র-ছাত্রী ভাই বোনেরা ছাত্র-ছাত্রী ডট কম পরিবারের পক্ষ থেকে তোমাদের জন্য রইলো বৈশাখী শুভেচ্ছা।

এসো আমরা ঘরে থাকি, সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখি। নিজে নিরাপদ থাকি এবং অন্যকে সচেতন করতেন করি।

করোনাভাইরাস সম্পর্কে মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ

প্রিয় ছাত্র-ছাত্রীরা, গনপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাদের উদ্দেশ্যে করোনাভাইরাস থেকে নিরাপদ থাকার জন্য কিছু পরামর্শ দিয়েছেন। এগুলো আমরা ফলো করতে পারি।

করোনা ভাইরাস ঠেকাতে ভূয়া পরামর্শ

বিশ্বের নানা দেশে করোনাভাইরাস দ্রুতবেগে ছড়িয়ে পড়ছে এবং এখন পর্যন্ত এর কোন প্রতিষেধক বের হয়নি।

তবে দুর্ভাগ্যবশত: করোনাভাইরাস ঠেকাতে নানা ধরণের স্বাস্থ্য পরামর্শ দেখা যাচ্ছে – যেগুলো প্রায়ই হয় অপ্রয়োজনীয় নয়তো বিপজ্জনক।

কিন্তু অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া এসব পরামর্শ সম্পর্কে বিজ্ঞানীরা কী বলছেন?

রসুন:

ফেসবুকে এমন অসংখ্য পোস্ট দেখা গেছে যেখানে লেখা: যদি রসুন খাওয়া যায় তাহলে সংক্রমণ প্রতিরোধ করা সম্ভব।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা বলছে “যদিও রসুন একটা স্বাস্থ্যকর খাবার এবং এটাতে এন্টিমাইক্রোবিয়াল আছে” কিন্তু এমন কোন তথ্য প্রমাণ নেই যে রসুন নতুন করোনাভাইরাস থেকে মানুষকে রক্ষা করতে পারে।

অনেক ক্ষেত্রেই এধরনের প্রতিকারক ব্যবস্থা মানুষের জন্য ক্ষতিকারক নয়। কিন্তু এর মাধ্যমেও ক্ষতি হতে পারে।

সাউথ চায়না মর্নিং পোস্ট সংবাদপত্রে খবর বের হয়েছে যে করোনাভাইরাস থেকে রক্ষা পেতে একজন নারী দেড় কেজি কাঁচা রসুন খেয়েছে। এতে করে তার গলায় ভয়াবহ প্রদাহ শুরু হয়। পরে ঐ নারীকে হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে হয়।

আমরা জানি ফল, সবজি, এবং পানি খেলে স্বাস্থ্য ভাল থাকে। কিন্তু নির্দিষ্ট কোন খাদ্য দিয়ে করোনাভাইরাস সংক্রমণ ঠেকানো সম্ভব হবে, এর পক্ষে কোন প্রমাণ এখনও পাওয়া যায়নি।

অলৌকিক সমাধান

জরডান সাথের হলেন একজন ইউটিউবার, বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে তার রয়েছে হাজার হাজার অনুসারী।

তিনি দাবি করছেন যে “একটা অলৌকিক খনিজ পদার্থ” যাকে এমএমএস নামে ডাকা হয় সেটা দিয়ে এই করোনাভাইরাস একেবারে দূর করা সম্ভব।

মি. সাথের এবং অন্যরা এই পদার্থকে করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার আগেই প্রচার করে আসছে।

কিন্তু জানুয়ারি মাসে তিনি টুইট করে বলেন “ক্লোরিন ডাই-অক্সাইড ক্যান্সারের কোষকেও ধ্বংস করতে পারে এবং এটা করোনাভাইরাসকে ধ্বংস করতে পারে।”

গত বছরে মার্কিন ফুড এন্ড ড্রাগ অ্যাডমিনিস্ট্রিশন সতর্ক করে বলে যে এমএমএস পান করা স্বাস্থ্যের জন্য হানিকর।

অন্যান্য দেশের স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষও এই বিষয়ে সতর্কতা জারি করেছে। করোনাভাইরাসের জীবাণু ধ্বংস অসম্ভব, যেমনটা বলছে এই গবেষণা। এফডিএ বলছে, তারা এমন কোন গবেষণা সম্পর্কে জানে না যে এই পদার্থ নিরাপদ অথবা কোন অসুস্থতার জন্য পথ্য হতে পারে।

এফডিএ সতর্ক করে বলেছে এটা পান করার ফলে, মাথাব্যথা, বমি, ডায়রিয়া, এবং পানিশূন্যতার লক্ষণ দেখা দিতে পারে।

ঘরে তৈরি জীবাণুনাশক

করোনাভাইরাস ঠেকানোর একটা কার্যকর উপায় হচ্ছে বার বার করে হাত ধোয়া।

হাত ধোয়ার জেল, যেটা দিয়ে তাৎক্ষণিক জীবাণু ধ্বংস করা যায়, সেটা ফুরিয়ে যাওয়ার শঙ্কা তৈরি হয়েছে।

ইটালি এখন করোনাভাইরাস আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে একটি।

সে দেশে যখন এই জেল ফুরিয়ে যাওয়ার খবর বের হল তখন এই জেল কীভাবে ঘরে বানানো যায় সেটার রেসিপি দেয়া শুরু হল সোশাল মিডিয়াতে।

কিন্তু সেসব রেসিপি ছিল মূলত সেই সব জীবাণুনাশকের – যা ঘরের মেঝে বা টেবিলের উপরিভাগে ব্যবহার করতে হয়।

কিন্তু বিজ্ঞানীরা জানিয়ে দেন এটা ত্বকের জন্য মোটেই উপযুক্ত নয়।

অ্যালকোহল যুক্ত হ্যান্ড জেলগুলোতে ৬০%-৭০% অ্যালকোহল থাকে তার সাথে থাকে এমোলিয়েন্ট নামে এক ধরণের পদার্থ যেটা ত্বককে নরম রাখে।

লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক স্যালি ব্লুমফিল্ড বলেছেন, তিনি বিশ্বাস করেন না ঘরে বসে হাতের জন্য উপযুক্ত জীবাণুনাশক তৈরি করা সম্ভব।

রূপার জল

কলোইডিয়াল সিলভার মূলত এমন জল যেখানে রুপার ক্ষুদ্র কণিকা মেশানো থাকে।

মার্কিন টেলি-ইভানজেলিস্ট ধর্মপ্রচারক জিম বেকার এই জল ব্যবহারের পরামর্শ দিয়েছেন।

তার অনুষ্ঠানে এক অতিথি দাবি করেন যে এই জল কয়েক ধরণের করোনাভাইরাস মেরে ফেলতে সক্ষম।

অবশ্য তিনি স্বীকার করেন যে কোভিড-১৯ এর ওপর এটা পরীক্ষা করে দেখা হয়নি।

কলোইডিয়াল সিলভারের সমর্থকরা দাবি করেন যে এটা অ্যান্টিসেপটিক, এবং নানা ধরনের চিকিৎসায় ব্যবহার করা চলে।

কিন্তু মার্কিন স্বাস্থ্য কর্তৃপক্ষ পরিষ্কার ভাষায় বলেছে, এই ধরনের রূপা ব্যবহার করে স্বাস্থ্যের কোন উপকার হয় না। বরং এর ব্যবহারে কিডনির ক্ষতি হতে পারে ও লোকে জ্ঞান হারাতে পারে।

তারা বলে, লোহা এবং জিংক যেমন মানব দেহের জন্য উপকারী, রূপা তেমনটা নয়।

১৫ মিনিট অন্তর জলপান

ফেসবুকের একটি অ্যাকাউন্ট থেকে এক পোস্টে একজন ‘জাপানি ডাক্তার’কে উদ্ধৃত করে বলা হয়েছে, করোনাভাইরাসের জীবাণু মুখের মধ্যে ঢুকে পড়লেও প্রতি ১৫ মিনিট পর পর পানি খেলে তা দেহ থেকে বের হয়ে যায়।

এই পোস্টের একটি আরবি ভার্সন ২৫০,০০০ বার শেয়ার হয়েছে।

কিন্তু লন্ডন স্কুল অব হাইজিন এন্ড ট্রপিক্যাল মেডিসিন বিভাগের অধ্যাপক স্যালি ব্লুমফিল্ড বলেছেন, এই দাবির পক্ষে সত্যিই কোন প্রমাণ নেই।

তাপমাত্রা ও আইসক্রিম পরিহার

গরমে এই ভাইরাস মরে যায় বলে সোশাল মিডিয়াতে অনেক ধরনের পরামর্শ দেয়া হচ্ছে।

গরম পানি পান করা, গরম জলে গোসল করা, এমনকি হেয়ারড্রায়ার ব্যবহারেরও সুপারিশ করা হচ্ছে।

ইউনিসেফের উদ্ধৃতি দিয়ে এমনি একটি পোস্ট নানা দেশে সোশাল মিডিয়ায় শেয়ার করা হচ্ছে।

এতে বলা হয়েছে, গরম জলপান করলে এবং রৌদ্রের নীচে দাঁড়ালে করোনাভাইরাসের জীবাণু মরে যাবে।

পাশাপাশি আইসক্রিম খেতেও বারণ করা হয়েছে।

কিন্তু ইউনিসেফ বলছে, এটা স্রেফ ভুয়া খবর। ফ্লু ভাইরাস মানব দেহের বাইরে বেঁচে থাকতে পারে না।

আর দেহের বাইরে এই জীবাণুকে মেরে ফেলতে হলে ন্যূনতম ৬০ ডিগ্রি সেলসিয়াস তাপমাত্রা লাগবে, যেটা গোসলের পানি থেকে অনেক বেশি গরম।

লেখাটি বিবিসি বাংলার সৌজন্যে

শিক্ষার প্রধান উদ্দেশ্য কি?

যে বৈশিষ্ট্যটি মানুষকে অন্য সব প্রাণীদের ওপর শ্রেষ্ঠত্ব দান করেছে তা মানুষের জ্ঞান বা বুদ্ধি। এই জ্ঞান বা বুদ্ধির বিকাশ ও সমৃদ্ধি ঘটে শিক্ষার মাধ্যমে। শিক্ষাই মানুষকে মর্যাদার শিখরে পৌঁছে দেয়। শিক্ষা ছাড়া কোনো জাতি পৃথিবীর বুকে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারে না। তাই বলা হয় ‘শিক্ষাই জাতির মেরুদণ্ড’। স্বভাবতই ইসলাম তাই এ গুরুত্বের স্বীকৃতি দিয়েছে গোড়া থেকেই। শেষ নবী মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের প্রতি প্রেরিত প্রথম ওহীই ছিল ‘আপনি পড়ুন’। আর ইসলামের নবী ইলম হাসিল ও জ্ঞানার্জনের প্রতি আরোপ করেছেন অশেষ গুরুত্ব।
জ্ঞান অর্জনের চিরন্তন দুই ধারা : পৃথিবীর আদি মানব আদম আলাইহিস সালামকে আল্লাহ তা‘আলা ইহ ও পরজগতের প্রয়োজনীয় সব জ্ঞান শিক্ষা দেন। সে থেকেই মানুষের জ্ঞান উন্নয়নের পথ চলা শুরু। পরবর্তীতে মানুষ ওই আসমানী জ্ঞানের আলোকে নিজেদের প্রয়োজনে জাগতিক জ্ঞানের নানা দিগন্ত উন্মোচন করতে থাকে। আসমানী জ্ঞানের সঙ্গে মানুষের দূরত্ব যত দীর্ঘ হয়েছে ততই তারা বস্তুর প্রতি ঝুঁকে পড়েছে। তাদের জ্ঞান হয়ে পড়েছে বস্তুনির্ভর। তাই বলা যায় পৃথিবীর প্রায় সূচনা লগ্ন থেকেই মানুষ দুইভাবে জ্ঞান আহরণ করে আসছে। এক. ইলমে ওহী বা সরাসরি জগৎস্রষ্টা আল্লাহর দূতের মাধ্যমে। দুই. মানব গোষ্ঠীর মধ্যে যারা জ্ঞানে অগ্রসর, যারা নিজেরাই অনেক নতুন জ্ঞানের দ্বার উম্মোচন করেন তাদের মাধ্যমে। মানুষ নিজের উদ্ভাবিত জ্ঞানের মাধ্যমে তাদের জাগতিক অগ্রগতি ও জীবন মানের উন্নতি করতে পেরেছে। কিন্তু রবের প্রেরিত জ্ঞান ছাড়া প্রকৃত শান্তি ও সাফল্য লাভ করতে পারে নি। পরবর্তীতে আরও অনেক উন্নতি করতে পেরেছে। আকাশে উড়েছে, হিমালয়ে উঠেছে, সমুদ্রের বুকে ঢুকে অমূল্য বস্তু আহরণ করেছে, চাঁদে গমন করতে পেরেছে, এমনকি মঙ্গলগ্রহে পর্যটন করেছে। তথাপি একটি জিনিসই পারে নি। পারে নি আদর্শ মানুষ হতে। অকৃত্রিম অপার্থিব আদর্শের বিভায় ধূলির ধরাকে শান্তির নীড় জান্নাত বানাতে পারে নি। হ্যাঁ প্রকৃত শান্তি লাভ করতে হলে, মানুষকে মানুষ হতে হলে, মানবিক গুণ অর্জন এবং চারিত্রিক উৎকর্ষ সাধন করতে হলে অবশ্যই তাকে ইলমে ওহী বা আসমানী জ্ঞান অর্জন করতে হবে। মানুষের জ্ঞান সসীম তাই এর দ্বারা শুধু বাহ্যিক জ্ঞান ও জাগতিক বিদ্যাই অর্জন সম্ভব। এর সমৃদ্ধি ও আধুনিকায়ন সম্ভব। কিন্তু এই দৃশ্য জগতের বাইরেও যে অনেক কিছু আছে। বর্তমান জীবনের পরেও যে আরেকটি জীবন আছে। অনন্ত এক জীবন। যার শুরু আছে; শেষ নেই। তার জ্ঞান ওহীর মাধ্যম ছাড়া অর্জন করা সম্ভব নয়।
মানুষ নিজের অর্জিত জ্ঞান দিয়ে দেহের বহিরাংশের সব চাহিদা মেটাতে পারে। কিন্তু সব চাহিদা পূরণের পরও তার শান্তি ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত হয় না যাবৎ সে দেহের ভেতরাংশ তথা অন্তরের খোরাকও যোগাতে সক্ষম হয়। বলাবাহুল্য, ওহীর বিদ্যা ছাড়া এই খোরাক যোগানো সম্ভব নয়। তাই যুগে যুগে মানুষের মাঝে এ বিদ্যার প্রচার ও বিস্তার ঘটিয়েছেন নবী-রাসূলগণ। আল্লাহ কর্তৃক প্রেরিত মহামানব দল। নবীর অনুপুস্থিতিকাল যখনই দীর্ঘ হয়েছে মানুষ ততই নিজের তৈরি অক্ষম জিনিসের দাসত্বে লিপ্ত হয়েছে। তাদের অর্জিত জ্ঞান এতে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারে নি। ওহীর জ্ঞানের ধারকরাই যুগে যুগে মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন ‘মানুষ সর্বশ্রেষ্ঠ জাতি’। তাই সে নিজের হাতে গড়া কোনো কিছুর অর্চনা বা দাসত্ব করতে পারে না। মানুষের স্বকল্পিত জ্ঞান তাকে এতোটা বিপথগামী ও অর্বাচিন বানিয়ে দেয় যে তারা বড় কিছু দেখলেই তাকে পূজা করতে শুরু করে। অহীর শিক্ষাই তাদেরকে এ গোলামী থেকে মুক্তি দিয়েছে।
সত্যি বলতে কি পৃথিবীতে যদি এক খোদার আসমানী বিদ্যা না আসত তাহলে মানুষ কখনো মহাকাশ গমন বা মঙ্গল জয়ের স্বপ্ন দেখতে পেত না। কারণ তারা তো এসব জিনিসকে এতোটা ভয় করত যে এসব জয়ের কল্পনা করার সাহসই তাদের ছিল না। যার দাসত্বের শৃঙ্খলে এরা বন্দি কীভাবে তারা তা জয়ের স্পর্ধা দেখাবে?
বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মাদরাসা শিক্ষা :
আল্লাহ তা‘আলা কিয়ামত পর্যন্ত এ ওহী-জ্ঞানের ভাণ্ডার হিসেবে নাযিল করেছেন পবিত্র কুরআন। এ কুরআনের বাস্তব ব্যাখা হিসেবে সুরক্ষিত হয়েছে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হাদীস ভাণ্ডার। আর কুরআন ও সুন্নাহ অনুধাবন এবং এ উৎসদ্বয় থেকে সর্ব যুগের সব মানুষের জীবনদিশা দিতেই গড়ে ওঠেছে ইসলামী শিক্ষার বাকি সব শাখা-প্রশাখা। মানুষের জাগতিক চাহিদা পূরণে যেমন চিকিৎসক, প্রকৌশলীসহ নানা বিষয়ে অভিজ্ঞ ও বিশেষজ্ঞ সম্প্রদায়ের প্রয়োজন, তাদের ইহ ও পরকালীন দীনী প্রয়োজন মেটাতেও দরকার তেমন ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানে পারদর্শী বিশেষজ্ঞ শ্রেণীর। জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে আল্লাহর হুকুম ও সঠিক নির্দেশনা পেতে যাদের কাছে ছুটে যাবেন আল্লাহর অনুগত দীনদার মুসলিমগণ।
এ কারণেই অধিকাংশ মুসলিম দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় ইসলামী জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখার পাঠদান করা হয় গুরুত্বের সঙ্গে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য যে সংখ্যাগরিষ্ট মুসলিমের এ বাংলাদেশে ইসলামী শিক্ষার প্রতি রাষ্ট্রের পৃষ্ঠপোষকতা সন্তোষজনক নয়। বলা যায় দায়সাড়া গোছের। স্কুল-কলেজগুলোতে জাগতিক শিক্ষাগুলোর প্রতিই যত সব মনোযোগ ও গুরুত্ব প্রদান করা হয়। ‘ইসলাম শিক্ষা’ নামে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তরে একটি অপর্যাপ্ত ও চির অবহেলিত সাবজেক্ট রয়েছে, যা বড় অনাদর ও অযত্নে পড়ানো হয়। এমতাবস্থায় এ দেশের মাদরাসাগুলোই কোটি কোটি মুসলিমের ধর্মীয় পিপাসা মেটাতে কম-বেশি সেবা করে যাচ্ছে।
বৃটিশ ঔপনিবেশিক আমলের ‘ধর্মবিহীন কর্মশিক্ষা’র মোকাবেলায় তাই ধর্ম ও কর্মমুখী ইসলামী শিক্ষা বেগবান করা দরকার। রাষ্ট্র ও জনগণ সবারই এ ব্যাপারে দায়িত্ব রয়েছে। সরকারকে যেমন পৃষ্ঠপোষকতা দিতে হবে জনগণকেও তেমন ইসলামী শিক্ষার প্রতি তাদের ভালোবাসা ও গুরুত্ব প্রমাণ করতে হবে। জীবিকার প্রয়োজনে সাধারণ শিক্ষার প্রতি সব গুরুত্ব ন্যস্ত করে শুধু কোনোমতে ‘কালেমা ও নামাজ শিখে নিজের দীনী প্রয়োজন মিটে গেছে’ এমন হঠকারি মনোভাব পরিহার করতে হবে।
মাদরাসা শিক্ষার দুই ধারা : উল্লেখ্য, বাংলাদেশে মাদরাসা শিক্ষার দু’টি ধারা রয়েছে। কওমী তথা বেসরকারি মাদরাসা শিক্ষা এবং আলিয়া তথা সরকারি মাদরাসা শিক্ষা। কওমী শিক্ষাধারায় নৈতিকতা ও হাতে-কলমে ইলম অনুযায়ী আমলে অভ্যস্ত করার প্রতি অধিক মনযোগ ও গুরুত্ব দেয়া হয়। তবে বিশেষ প্রেক্ষাপটে তথা মুসলিমদের শাসনব্যবস্থা বিলুপ্ত হবার পর ইংরেজদের ইসলামী শিক্ষা নির্মূলের চক্রান্তের প্রেক্ষাপটে এ ধারার শিক্ষা প্রবর্তিত হওয়ায় তাতে সে সময়ের আবেদন ও প্রয়োজনের প্রতি সবিশেষ গুরুত্ব বর্তমান। সঙ্গত কারণেই এতে পরিবর্তিত বিশ্ব ব্যবস্থায় আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানের অনেক প্রয়োজনীয় শাখা যথাযথ গুরুত্ব পায় নি।
তাই এর সিলেবাসকে যুগোপযোগী করার তীব্র প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করছেন খোদ এ ধারার অভিজ্ঞ শিক্ষকমহল পর্যন্ত। তাছাড়া এ ধারার মাদরাসাগুলোর সিলেবাসের মৌলিক কিতাবাদিতে মোটামুটি মিল থাকলেও বুনিয়াদি অনেক বিষয়ে বিভিন্ন মাদরাসার মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য বিদ্যমান। একই সিলেবাসের অধীনে সবগুলো বোর্ডের যুগোপযোগী সিলেবাস প্রণয়ন তাই সময়ের দাবি। তবে এ ধারার প্রতি সরকারের স্বীকৃতি বা পৃষ্ঠপোষকতা না থাকায় কওমী মাদরাসা থেকে বেরিয়ে আসা হাজার হাজার যোগ্য ব্যক্তিরাও ইসলাম ও সমাজের জন্য কাঙ্ক্ষিত পরিসরে অবদান রাখতে পারছেন না।
পক্ষান্তরে আলিয়া ধারায় যুগচাহিদা ও আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানকে উদারভাবে আত্মীকরণ করা হলেও ইলম অনুযায়ী আমলের দিকটি যথাযথ গুরুত্ব পায় না। হাতে গোনা কয়েকটি ঐতিহ্যবাহী আলিয়া মাদরাসা ছাড়া অধিকাংশতেই স্কুল-কলেজের সঙ্গে প্রতিযোগিতার দিকটিই বেশি গুরুত্ব পায়। কুরআন-সুন্নাহর জ্ঞানে পারঙ্গমতার বদলে সাধারণ শিক্ষার মতো এখানেও কেবল রেজাল্ট ভালো করে ভালো চাকরির জন্য সব রকমের চেষ্টার প্রবণতা দিনদিন প্রবল হচ্ছে। এই মানসিকতায় পরিবর্তন এনে সবার উচিত ইসলামী শিক্ষার মূল উদ্দেশ্য সম্পর্কে সজাগ হওয়া। তেমনি রাষ্ট্রেরও কর্তব্য এ ধারায় শিক্ষিতদের যোগ্যতা ও পছন্দ অনুযায়ী উচ্চ শিক্ষা অর্জনের পথ অবাধ ও সুগম করা।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে মাদরাসা শিক্ষার প্রয়োজনীয়তা : বিজ্ঞানের অভূতপূর্ব উৎকর্ষের এ যুগে মাদরাসা শিক্ষার গুরুত্ব পূর্বের যে কোনো সময়ের চেয়ে বৃদ্ধি পেয়েছে। মানুষের যখন যা প্রয়োজন বিজ্ঞান মুহূর্তেই তার সামনে হাজির করছে। আজ মানুষ সব পাচ্ছে। যখন যা দরকার মুহূর্তেই তা পেয়ে যাচ্ছে। এতে মানুষের স্বস্তি হয়তো এসেছে কিন্তু তার মূল আরাধ্য তথা আত্মিক প্রশান্তি ও মানসিক পরিতৃপ্তি হারিয়ে যাচ্ছে অদৃশ্য চোরাবালিতে।
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি আল্লাহরই নেয়ামত। এর ভালো ও মন্দ উভয় দিক রয়েছে। সৎ ব্যবহার কল্যাণ বয়ে আনে। অসৎ ব্যবহার অশান্তি ডেকে আনে। দিন দিন প্রযুক্তির দান যত বৃদ্ধি পাচ্ছে ততধিক বেড়ে চলেছে এর নেতি ও অপ ব্যবহার। মানুষের কল্যাণে যে পারমাণবিক শক্তির আবিষ্কার; তা আজ সমগ্র মানব জাতির শান্তি ও নিরাপত্তার জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে। যাতায়াত ব্যবস্থার সুবিধা ও সমৃদ্ধিতে যে বিমানের আবিষ্কার তা দিয়ে বোমা ফেলে লক্ষ লক্ষ মানুষ হত্যা করা হচ্ছে। শুধু তাই নয়, দেশে আজ প্রতিযোগিতা শুরু হয়েছে অস্ত্র কেনার। সেরা জীব মানুষের খাদ্য ও প্রয়োজন না মিটিয়ে বাজেটে সমরাস্ত্র কেনার প্রতিই দেয়া হচ্ছে অধিক গুরুত্ব। তথ্যের অবাধ প্রবাহ ও আদান-প্রদান সহজের জন্য যে তথ্য প্রযুক্তির আবিষ্কার তা আজ সাইবার ক্রাইমের আখড়ায় পরিণত হয়েছে। তাই দেখা যায় উন্নত বিশ্বের নাগরিকরা সব পেয়েও আজ শান্তির জন্য হাহাকার করছে। আত্মিক প্রশান্তির অন্বেষায় দিগ্বিদিগ ছোটাছুটি করছে।
বাস্তবতা হলো, মানুষকে মানুষ বানাতে, প্রযুক্তির অপব্যবহার রুখতে এবং পৃথিবীতে কাঙ্ক্ষিত শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে ইসলামী বা নৈতিক তথা মাদরাসা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এর প্রমাণ হিসেবে বর্তমান যুব সমাজের নৈতিক অবক্ষয়ের সাম্প্রতিক কিছু টিত্র তুলে ধরাই যথেষ্ট মনে করি। সরকারের চলমান মাদক বিরোধী অভিযান আমাদের সামনে নৈতিকতাহীন শিক্ষার কুফল তুলে ধরেছে। বহুল আলোচিত মাদক বড়ি ইয়াবা ও আইসপিলের ক্রেতা ও ভোক্তা কারা? তারা কি গোমূর্খ নাকি অভদ্র ঘরের সন্তান? মিডিয়ার কল্যাণে দেশবাসী জেনেছেন, তারা সম্ভ্রান্ত পরিবার পথভ্রান্ত শিক্ষিত সন্তান। কিন্তু কোন হীন কাজটাই আছে যা তারা করে নি বলুন? র্যাবের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা মারফত জানা যায়, এদের ঘরে যা পাওয়া যাচ্ছে তা মিডিয়ার সামনে আনা তো দূরের কথা এর আলোচনাও করার মত নয়।
পত্রিকা মারফত সবাই জেনেছেন, হাজার হাজার কলেজ-পড়ুয়া আলট্রা মডার্ন শিক্ষিতা সুন্দরীরা অভিযাত হোটেলগুলোয় গিয়ে কী করে? কাগজে ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়েছে, প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ধনীর দুলাল-দুলালীরা কাদের খপ্পরে পড়ে সর্বস্ব হারাচ্ছে? শিক্ষা, প্রাচুর্য, বংশকৌলীণ্য- কোনটার অভাব এদের? কোনোটারই অভাব নেই। অভাব শুধু নৈতিক শিক্ষার। নৈতিক শিক্ষা ছাড়া মানুষ আর সব হলেও পারে না শুধু মানুষ হতে। বলাবাহুল্য, আমাদের নৈতিক শিক্ষার সর্বোৎকৃষ্ট উৎস ইলমে ওহী যা এ দেশের মাদরাসাগুলোয় শেখানো হয়।
শেষ কথা : সমাজের এই অবক্ষয় দেখে আজ দেশবাসী চমকে ওঠেছেন। এদের প্রতিরোধে সরকারও চালিয়ে যাচ্ছে সক্রিয় তৎপরতা। মাদক রোধে, ভবিষ্যৎ প্রজন্ম রক্ষায় বুদ্ধিজীবী কলামিষ্টরাও সরকারকে অনেক উপদেশ দিচ্ছেন। তারা বলছেন না শুধু আসল কথাটিই। বলছেন না, নৈতিকতার চর্চা ও ধর্মীয় শিক্ষার প্রসার ঘটানো হোক।
মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনতামূলক কার্যক্রম চলে আসছে অনেক আগে থেকেই কিন্তু এর রেজাল্ট কী? রেজাল্ট কি এই নয়, যা আমরা দেখতে পাচ্ছি? মাদকের বিরুদ্ধে যারা শ্লোগান দেন তারাই তো ধূমপান করেন। অনেকে একধাপ এগিয়ে বিভিন্ন তারকা বিশিষ্ট হোটেলে গিয়ে গঞ্জিকা সেবন না করলেও বিয়ার, শ্যাম্পেন বা এর চেয়েও দামীগুলো সেবন করেন। কিছু বুদ্ধিজীবী কলামিষ্ট আছেন এক পেগ মদ না গিললে যাদের কলম থেকে লেখাই বেরোয় না। এদের মধ্যে নিষিদ্ধ পল্লীর বিরল প্রজাতি খদ্দের একেবারেই যে দুর্লভ; তাও কিন্তু নয়। আজকের মিডিয়াগুলো মাদককে না বলা এসব স্বেচ্ছাসেবীদের তৎপরতাকে কত মহৎ হিসেবে প্রচার ও উপস্থাপন করে। অথচ সত্যিকার অর্থেই যারা মাদক থেকে যোজন কিলোমিটার দূরে অবস্থান করে, মাদকের কালো হাত যাদের কখনো স্পর্শ করতে পারে না সেই নৈতিক ও ধর্মীয় শিক্ষার আলয় তথা মাদরাসা শিক্ষার কথা মিডিগুলোয় গুরুত্ব পায় না।
ধর্মীয় বা মাদরাসা শিক্ষায় শিক্ষিত বিশাল জনগোষ্ঠীর দিকে তাকিয়ে দেখুন এদের কয়জন মাদকাসক্ত? ক’জন তথাকথিত অভিজাত হোটেলগুলোর সদস্য? এসিড নিক্ষেপ, যৌতুকের জন্য স্ত্রী নির্যাতন, পরকীয়ার টানে ঘরের বৌ খুনসহ নানা অনৈতিক কর্মকাণ্ডের কয়টি এদের হাতে সংঘটিত হয়? এসব অপরাধের বিরুদ্ধে এদেরকে আলাদাভাবে সচেতন করতে হয় না। অপরাধ যে অপরাধ তা বুঝানোর জন্য এত সেমিনার ও প্রচারাভিযানের প্রয়োজন হয় না। এর কারণ কী? কারণ, ওহী তথা আসমানী শিক্ষার আদ্যোপান্তই মানুষকে নৈতিকভাবে সমৃদ্ধ ও বলীয়ান করে তোলে।
অতএব দেশ ও জগতে শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে, সকলের ইহ ও পরকালের শান্তি ও সাফল্য নিশ্চিত করতে আসুন মাদরাসা তথা ইসলামী শিক্ষাকে বেগবান করি। নিজেরা এ শিক্ষায় আলোকিত হবার পাশাপাশি সবাই আমরা ইসলামী শিক্ষা প্রসারে সাহায্য ও সহযোগিতা করি। আল্লাহ আমাদের সহায় হোন। আমীন।

লেখকঃ হাসান তৈয়ব , গবেষক ও চিন্তাবিধ